ইমরান হোসেন পিংকু
গ্রামের অসহায়, দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের চিকিৎসার শেষ ভরসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অথচ যশোরের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর চাপ বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি চিকিৎসক ও জনবল।
৫০ শয্যার হাসপাতালে কোথাও প্রতিদিন ভর্তি থাকছেন ৯০ থেকে ১০০ রোগী। চিকিৎসকের অনুমোদিত পদও বিপুলসংখ্যক শূন্য। কোথাও অ্যানাস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ না থাকায় অস্ত্রোপচার বন্ধ, কোথাও প্যাথলজিস্ট নেই। আবার কোথাও আল্ট্রাসোনোগ্রাম ও এক্স-রে মেশিন থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় সেবা মিলছে না।
ফলে বাধ্য হয়ে রোগীদের ছুটতে হচ্ছে জেলা শহরের হাসপাতাল কিংবা বেসরকারি ক্লিনিকে। এতে দরিদ্র পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে, অনেককে ধার-দেনা করেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা, বাঘারপাড়া, অভয়নগর, শার্শা, মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। শয্যার তুলনায় রোগীর চাপ বেশি থাকলেও চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ানসহ প্রয়োজনীয় জনবলের সংকটে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো।
যশোর জেলা স্বাস্থ্য বিভাগে তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, সাতটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ১ হাজার ৩৯৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৯৪১ জন। ফলে ৪৫৭টি পদ শূন্য, অর্থাৎ মোট অনুমোদিত পদের প্রায় ৩২.৭ শতাংশ পদই খালি। এর মধ্যে থেকে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪৩টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত ২৫ জন।
মণিরামপুরে ৪৭টির মধ্যে ২৬ জন এবং বাঘারপাড়ায় ৪০টির মধ্যে ২০ জন চিকিৎসক কর্মরত। কেশবপুরে ৪৩টির মধ্যে ২৫ জন, ঝিকরগাছায় ৪৬টির মধ্যে ২৯ জন এবং শার্শায় ৩০টির মধ্যে ১৮ জন চিকিৎসক রয়েছেন। অভয়নগরে ৩৮টি পদের মধ্যে কর্মরত ২৪ জন। অথাৎ সাত উপজেলায় মোট অনুমোদিত চিকিৎসক পদ ২৮৭। এর মধ্যে ১২০টি পদে চিকিৎসক নেই।
চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আহসানুল মিজান রুমী বলেন, চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ শয্যার বিপরীতে ভর্তি থাকেন ৯০ থেকে ১০০ রোগী। চিকিৎসকের ৪৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৪ জন। এখানে শুধু সিজারিয়ান অপারেশন হয়। তবে অ্যানাস্থেশিয়া পদটি দীর্ঘদিন শূন্য। আল্ট্রাসোনোগ্রাম মেশিন থাকলেও তা পরিচালনার জন্য কোনো চিকিৎসক নেই। হাসপাতালের মোট ২২১টি পদের বিপরীতে কর্মরত ১২৭ জন; শূন্য রয়েছে ৯৪টি পদ।
ঝিকরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আবদুর রশিদ বলেন, জনবল সংকটের মধ্যেই সেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। চিকিৎসকের ৪৬টি পদের মধ্যে কর্মরত ২৯ জন। এখানে শুধু সিজারিয়ান অপারেশন হয়, তাও সপ্তাহে শুধু বৃহস্পতিবার। অ্যানাস্থেশিয়া চিকিৎসক থাকলেও তিনি সপ্তাহে তিন দিন ঝিকরগাছায় দায়িত্ব পালন করেন।
একই সঙ্গে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। এক্স-রে ও আল্ট্রাসোনোগ্রাম মেশিন থাকলেও আল্ট্রাসোনোগ্রামের জন্য সরকারি চিকিৎসক নেই। হাসপাতালের ২২৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত ১৮২ জন; শূন্য ৪৬টি।
বাঘারপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অরুপ জ্যোতি ঘোষ জানান, সীমিত জনবল দিয়ে বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে। চিকিৎসকের ৪০টি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ২০ জন। অ্যানাস্থেশিয়া চিকিৎসক থাকলেও তিনি বাঘারপাড়ায় সপ্তাহে মাত্র দুই দিন দায়িত্ব পালন করেন; বাকি চার দিন অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন সদর হাসপাতালে। মোট ১৫০টি পদের মধ্যে কর্মরত ১০৪ জন, শূন্য ৪৬টি।
অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মিজানুর রহমান বলেন, রোগীর চাপ অনুযায়ী জনবল আরও প্রয়োজন। অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ শয্যার বিপরীতে ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। চিকিৎসকের ৩৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত ২৪ জন। মোট ১৩৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছে ১১০।
শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌফিক পারভেজ বলেন, শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের ৩০টি পদের মধ্যে কর্মরত ১৮ জন। অ্যানাস্থেশিয়া চিকিৎসক থাকলেও তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন সদর হাসপাতালে। হাসপাতালের ১৯৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত ১০২ জন; শূন্য ৯২টি পদ।
মণিরামপুরে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফাইয়াজ আহমেদ ফয়সাল জানান, অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে জনবল সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ শয্যার বিপরীতে ভর্তি থাকেন ৯০ থেকে ১০০ জন রোগী। চিকিৎসকের ৪৭টি পদের মধ্যে কর্মরত ২৬ জন। মোট ২৪৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত ১৬৯ জন, শূন্য ৭৮টি।
কেশবপুরে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেহেনেওয়াজ বলেন, প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতার কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। চিকিৎসকের ৪৩টি পদের মধ্যে কর্মরত ২৫ জন। প্যাথলজি বিভাগ চালু থাকলেও প্যাথলজিস্ট নেই। ফলে পরীক্ষার জন্য রোগীদের বাইরের বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হয়। এক্স-রে ও আল্ট্রাসোনোগ্রাম মেশিনও অচল। হাসপাতালের ২২০টি পদের বিপরীতে কর্মরত ১৪৭ জন; শূন্য ৭৩টি পদ।
এ বিষয়ে যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে রোগীর চাপ দ্রুত বাড়লেও সে অনুযায়ী চিকিৎসক ও জনবল বাড়েনি। ফলে শয্যার অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে সীমিত জনবলকে বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে অচল যন্ত্রপাতি মেরামত এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসক-টেকনিশিয়ান নিয়োগ না হওয়ায় রোগীদের জেলা শহর কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে যেতে হচ্ছে। এ বিষয়ে চাহিদা জানানো হয়েছে। দ্রুত এর সমাধান হবে।’
