খবির শিকদার
পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের ইতিহাসে পহেলা মে এক অবিস্মরণীয় দিন। এটি কেবল একটি দিবস নয়; এটি রক্তে লেখা সংগ্রামের ইতিহাস, অধিকার আদায়ের প্রতীক, এবং শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসের নাম। আজ আমরা যখন পহেলা মে উদযাপন করি, তখন আমাদের শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়—এর গভীর ইতিহাস, রাজনৈতিক তাৎপর্য এবং বর্তমান বাস্তবতার সাথে এর সম্পর্ক বুঝতে হবে।
পহেলা মে’র ইতিহাস: রক্তাক্ত সংগ্রামের সূচনা
১৮৮৬ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলনে নামে। সে সময় শ্রমিকদের ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করা হতো। এই অমানবিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে তারা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ৪ মে, হে-মার্কেট স্কোয়ারে পুলিশের গুলিতে বহু শ্রমিক নিহত হন। এই রক্তাক্ত ঘটনার মধ্য দিয়েই শ্রমিক আন্দোলন বিশ্বব্যাপী নতুন গতি পায়।
পরবর্তীতে ১৮৮৯ সালে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতারা পহেলা মে’কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। এই দিনটি তখন থেকেই শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।
কমিউনিস্ট আন্দোলন ও শ্রমিক শ্রেণীর ঐতিহাসিক ভূমিকা
বিশ্ব রাজনীতিতে শ্রমিক শ্রেণীর উত্থান ও অধিকার প্রতিষ্ঠার পেছনে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভূমিকা অপরিসীম। তারা শুধু শ্রমিকদের অর্থনৈতিক দাবিই তুলে ধরেনি, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নও সামনে এনেছে। তাদের বিশ্বাস ছিল—শ্রমিক শ্রেণীই পারে শোষণমুক্ত সমাজ গড়তে।
শ্রমিকদের সংগঠিত করা, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শ্রেণীচেতনা সৃষ্টি—এসবই ছিল এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। ইতিহাস প্রমাণ করে, যেখানে শ্রমিকরা সংগঠিত হয়েছে, সেখানে তারা তাদের অধিকার আদায়ে সফল হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শ্রমিক শ্রেণীর বাস্তবতা
বাংলাদেশ একটি শ্রমনির্ভর দেশ। গার্মেন্টস, নির্মাণ, পরিবহন, কৃষি, টেলিকম, ফাইন্যান্সসহ বিভিন্ন খাতে লাখো শ্রমিক কাজ করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য—এই শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এখনও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত।
বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানেই শ্রমিকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, ওভারটাইমের সঠিক হিসাব নেই, কর্মপরিবেশ নিরাপদ নয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—শ্রমিকরা তাদের অধিকার নিয়ে কথা বললেই চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হয়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়।
ট্রেড ইউনিয়নের অভাব বা কার্যকারিতা না থাকায় শ্রমিকরা সংগঠিত হতে পারছে না। ফলে তারা একা, বিচ্ছিন্ন এবং দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে মালিকপক্ষ সহজেই তাদের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারছে।
মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক: লুকোচুরি ও বাস্তবতা
