বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
দিনে আবছা দেখেন, সন্ধ্যা নামলেই দু’চোখে ঘোর অন্ধকার। মাথা গোঁজার ঠাঁই বলতে পুকুরের পাড়ে হেলে পড়া একটি নড়বড়ে কাঠের দোকান। নেই বিছানা, বালিশ কিংবা কাঁথা। কয়েকটি বস্তা ও প্যাকেটই রাতে তার বালিশ। পাশে কয়েকটি প্লাস্টিকের জারে শুধু মুড়ি। কেউ খাবার দিলে খান, না দিলে না খেয়েই কাটে রাত। এভাবেই বছরের পর বছর মানবেতর জীবন কাটছে ৯০ বছরের বৃদ্ধা নবীরুন্নেসার। সরকারি কেনো সুয়োগ সুবিধাও পাননা তিনি। মণিরামপুর উপজেলার শ্যামকুড় ইউনিয়নের আগরহাটি গ্রামের একটি বড় পুকুরের এক কোণে ঠাঁই হয়েছে তার। কাঠের ঘরটির খুঁটি নড়বড়ে। সামনের অংশ পানির দিকে হেলে পড়েছে। যেকোনো সময় সেটি ভেঙে পুকুরে পড়ে যেতে পারে। অথচ এই ঝুঁকিপূর্ণ ঘরটিই বৃদ্ধার একমাত্র আশ্রয়।
সম্প্রতি আগরহাটি গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুকুর পাড়ে ভাসমান পাতার মতো দাঁড়িয়ে আছে জরাজীর্ণ কাঠের দোকানটি। ঘরের ভেতর ঢুকলেই চোখে পড়ে অসহায়ত্বের চিত্র। থাকার মতো কোনো আসবাব নেই। নেই রান্নার ব্যবস্থা। এক কোণে কয়েকটি প্লাস্টিকের ছোট জার। সেগুলোতে রাখা মুড়ি। আর কয়েকটি বস্তা ও প্যাকেটে রাতে তার বালিশ হিসেবে কাজে আসে।
অশ্রুসিক্ত চোখে নবীরুন্নেসা বলেন, ‘আমি খাবো কী, থাকবো কোথায়? দোকানটা ওরা দিছিলো বলে বাঁচা। তাও এখন দেখছি, ভেঙে পড়েছে। এখন আমি থাকবো কোথায়?’

প্রতিবেশিরা জানান, দিনের আলোতেও আবছা দেখেন তিনি। সন্ধ্যা নামলেই দৃষ্টিশক্তি যেন পুরোপুরি হারিয়ে যায়। চোখে না দেখায় কোথাও যেতে পারেন না। ফলে অন্যের সাহায্যের ওপরই নির্ভর করতে হয় তাকে। কেউ খাবার দিলে খান, না দিলে খালি পেটেই থাকতে হয়। আশপাশের কয়েকটি পরিবার খাবার দিয়ে সহযোগিতা করেন।
নবীরুন্নেসা বলেন, ‘যেদিন কেউ মনে করে তার কথা, সেদিন খাই। যেদিন ভুলে যায়, সেদিন না খেয়েই রাত পার করতে হয়।’ নবীরুন্নেসার জীবনের এই নিঃসঙ্গতার শুরু আরও বহু বছর আগে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বেনাপোলের বারোপোতা এলাকায় তার স্বামী হবিবুর রহমান নিখোঁজ হন। কোথায়, কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, আজও তা নিশ্চিত করে বলতে পারেন না কেউ।
স্বামীকে হারানোর পর প্রায় এক বছর খোঁজাখুঁজি করেন নবীরুন্নেসা। স্বামীর সন্ধান না পেয়ে দুই মেয়েকে নিয়ে চলে আসেন নিজের জন্মদাতা বাবার বাড়ি মণিরামপুরের শ্যামকুড় ইউনিয়নের আগরহাটি গ্রামে। বাবার বাড়িতে পাওয়া সামান্য সম্পত্তিই ছিল তার একমাত্র সম্বল।
বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া সম্পদ বিক্রি করে, ভাই ও ভাইপোদের সহযোগিতায় দুই মেয়েকে বিয়ে দেন। এরপর ধীরে ধীরে নিঃস্ব হয়ে পড়েন তিনি। নবীরুন্নেসা বলেন, তার এক মেয়ে শ্বশুরবাড়ির যৌতুকের চাপ প্রায় ২০ বছর আগে আত্মহত্যা করেন। অন্য মেয়ের সংসারও অস্বচ্ছল। ফলে ১৯৭৩ সালে বাবার বাড়িতে ফিরে আসার পর সুখের মুখ দেখেনি তিনি। শেষ জীবনেও একাকী কাটছে। নবীরুন্নেসা বলেন, ‘চোখে দেখতে পেলে আর কাউকে জ্বালাতাম না। মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও খায়ে-পরে বাঁচতে পারতাম।’
গ্রামের বাসিন্দা মামুনুর রশীদ মিন্টু বলেন, ‘নবীরুন্নেসা সম্পর্কে আমার ফুফু। আমরা সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। তবে তার থাকার মতো কোনো জায়গা নেই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মানবিক দৃষ্টিতে বিষয়টি দেখলে বৃদ্ধ বয়সে তিনি একটু স্বস্তি পেতেন।’
মণিরামপুরের সাংবাদিক তাজাম্মুল বলেন, বসতভিটার নিজস্ব জায়গা না থাকায় প্রায় ২০ থেকে ২২ বছর আগে আগরহাটি গ্রামের একটি বড় পুকুরের এক পাশে বৃদ্ধার থাকার ব্যবস্থা করে স্থানীয়রা। এর আগে তিনি ভাইপোদের বাড়িতে থাকতেন। এক ভাইপো তাকে জরাজীর্ণ কাঠের দোকানটি এনে দেন। সেটিই ধীরে ধীরে তার স্থায়ী আশ্রয়ে পরিণত হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আশ্রয়ও এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। খুঁটিগুলো নড়বড়ে হয়ে গেছে। কাঠ পচে গেছে। ঘরটি একদিকে কাত হয়ে আছে। ঝড়-বৃষ্টিতে যেকোনো সময় সেটি পুকুরে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, নবীরুন্নেসার ভাইদের পরিবারও আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল। ফলে তাকে স্থায়ীভাবে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়ার সামর্থ্য তাদের নেই। প্রতিবেশীদের সামান্য সহায়তাতেই কোনো রকমে টিকে আছেন তিনি।
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি দ্রুত খোঁজখবর নিয়ে দেখা হবে। নবীরুন্নেসার বর্তমান পরিস্থিতি সরেজমিনে যাচাই করে তার জন্য নিরাপদ আবাসন ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করতে উদ্যোগ নেয়া হবে। বয়সের শেষ প্রান্তে এসে যেন তাকে এভাবে মানবেতর জীবনযাপন করতে না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্ভব সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’
