বাংলার ভোর প্রতিবেদক 
কৃত্রিম সংকট ও অবৈধ মজুতদারের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে সরকার। জালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে মজুতদারদের জন্য স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। টানা দ্বিতীয় মাসের মতো এপ্রিলেও অপরিবর্তিত থাকছে জ¦ালানি তেলের দাম, ফলে মজুতদারদের প্রত্যাশা ভেস্তে দিয়ে কঠর অবস্থানের জানান দিল সরকার। এটাকে বাজার নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

মঙ্গলবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। আদেশ বলা হয়েছে, ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, পেট্রল ১১৬ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকায় বিক্রি হবে। যা ফেব্রুয়ারি ও মার্চেও একই দামে বিক্রি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা থাকলেও দেশের বাজারে কৃত্রিম সংকটের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় মূল্য না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তেলের সরবরাহ কমিয়ে বা গোপনে মজুদ করে বাজারে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। এমন অভিযোগ সরকারের কাছে এসেছে। ফলে দাম বাড়ানো হলে তারা আরও উৎসাহিত হতে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

অন্যদিকে, অবৈধ মজুদ ও অতিরিক্ত দামে বিক্রি ঠেকাতে সারাদেশে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে পরিচালিত এসব অভিযানে বেশ কিছু অনিয়ম ধরা পড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত ৬৪ জেলায় মোট ৩ হাজার ৫৫৯টি অভিযান পরিচালিত হয়। এতে ১৯১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৫ হাজার ৭০ টাকা। পাশাপাশি কয়েকটি জেলায় মজুদ ও অনিয়মের দায়ে কারাদণ্ডও দেয়া হয়েছে।

তবে এসব উদ্যোগের পরও বাজার পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। বিভিন্ন এলাকায় খুচরা পর্যায়ে তেল পাওয়া গেলেও সরবরাহে ধীরগতি রয়েছে। কোথাও কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগও উঠছে। এতে পরিবহন চালক, কৃষক ও সাধারণ ভোক্তারা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। অনেক স্থানে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে, আবার কোথাও পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু দাম অপরিবর্তিত রাখলেই সংকট পুরোপুরি কাটবে না। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমে মজুতদারদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে না পারলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

এদিকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন করে বড় পরিমাণ তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে ২ লাখ ৬০ হাজার টন জ্বালানি তেল কেনার অনুমোদন দেয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল এবং ১ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই আমদানি কার্যক্রম সম্পন্ন হলে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু করে সরকার। এই পদ্ধতিতে আগের মাসে আমদানি করা জ্বালানি তেলের গড় খরচ বিবেচনায় নিয়ে প্রতি মাসে নতুন দাম সমন্বয় করা হয়। এ সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয় ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি।

নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে ব্যবহৃত পেট্রল ও অকটেন মূলত ব্যক্তিগত যানবাহনে বেশি ব্যবহৃত হয়। তাই বাস্তবতার নিরিখে এগুলোকে বিলাসপণ্য হিসেবে বিবেচনা করে ডিজেলের তুলনায় বেশি দাম রাখা হয়। অন্যদিকে উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জেট ফুয়েল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), আর ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম নির্ধারণ করা হয় নির্বাহী আদেশে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভোক্তাদের প্রত্যাশা স্পষ্ট-কেবল দাম স্থির রাখাই নয়, বাজারে কৃত্রিম সংকট বন্ধ করে স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। মজুতদারদের সিন্ডিকেট ভেঙে না দিলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Share.
Exit mobile version