শরিফুল ইসলাম :
যশোর শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ মনিহার থেকে মুড়লী পর্যন্ত যশোর-খুলনা মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যানবাহন পার্কিং ও ব্যবসায়িক কাজে সড়কের জায়গা ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও সারি সারি বাস দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে, কোথাও বাসের সঙ্গে কাভারভ্যান ও দূরপাল্লার যানবাহনের পার্কিং, আবার কোথাও পুরোনো গাড়ি কাটা ও যন্ত্রাংশের ব্যবসার মালামাল রাখা হচ্ছে সড়কের পাশে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাইভেট মাইক্রোবাসের স্ট্যান্ড। সব মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। বাড়ছে যানজট, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও জনদুর্ভোগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সড়কের পাশে এভাবে যানবাহন দাঁড় করিয়ে রাখা এবং ব্যবসায়িক কাজে জায়গা ব্যবহারের কারণে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে নড়াইল স্ট্যান্ড এলাকায় বাস পার্কিংয়ের কারণে শহরে প্রবেশের মুখে প্রায়ই যানজট তৈরি হচ্ছে। ঈগল পরিবহনের ওয়ার্কশপের সামনে বাস-কাভারভ্যান রাখা এবং বকচর-হুশতলা এলাকায় পুরোনো গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ব্যবসার মালামাল সড়কের পাশে রাখায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। অথচ এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন বাস, ট্রাক, ইজিবাইক, মাহিন্দ্রা, মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মনিহার থেকে মুড়লী পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বাস ও অন্যান্য যানবাহন দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে। কোথাও একাধিক যানবাহন দীর্ঘ সময় অবস্থান করায় সড়কের স্বাভাবিক চলাচলের জায়গা কমে যাচ্ছে। ফলে অন্য যানবাহনকে সংকীর্ণ অংশ দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। ব্যস্ত সময়ে যানবাহনের চাপ বাড়লে তৈরি হচ্ছে যানজট। পথচারীদেরও ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পার হতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
নড়াইল স্ট্যান্ডে বাসের সারি
যশোর শহরে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নড়াইল স্ট্যান্ড এলাকায় বাস পার্কিং নিয়ে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের ভাষ্য, স্ট্যান্ডের বাসগুলো সড়কের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখায় যান চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে। সকাল ও বিকেলের ব্যস্ত সময়ে যানবাহনের চাপ বাড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও পথচারীদের এ কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
মণিহার পুরোনো বাসস্ট্যান্ড এলাকার বাসিন্দা জহুরুল হক বলেন, “নড়াইল স্ট্যান্ডের বাসগুলো প্রায়ই মহাসড়কের ওপর যত্রতত্র দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এতে সড়কের একাংশ কার্যত পার্কিংয়ের জায়গায় পরিণত হয়েছে। অন্য যানবাহনকে তখন সীমিত জায়গা দিয়ে চলাচল করতে হয়।
সকাল-বিকেলে যানবাহনের চাপ বাড়লে এখানে যানজট তৈরি হয়, কখনো দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হয়। জরুরি কাজে বের হওয়া মানুষও ভোগান্তিতে পড়েন। এভাবে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক চলতে পারে না। বাস রাখার নির্দিষ্ট জায়গা ঠিক করে দিয়ে সড়কটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা দরকার। এ সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”
আরএক বাসিন্দা রহমান বলেন, নড়াইল স্ট্যান্ডের বাসগুলো নির্ধারিত স্থানে রাখার ব্যবস্থা করা না গেলে এ ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলবে না। তাদের দাবি, সড়কের ওপর বাস পার্কিং বন্ধে নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে।
ঈগল পরিবহনের ওয়ার্কশপের সামনেও যানবাহন পার্কিং
মহাসড়কের আরেকটি সমস্যাপ্রবণ স্থান ঈগল পরিবহনের ওয়ার্কশপের সামনের অংশ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে প্রায়ই তিন থেকে চারটি বাস, কাভারভ্যানসহ দূরপাল্লার বিভিন্ন যানবাহন দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এসব যানবাহন মহাসড়কের চলাচলের অংশে অবস্থান করায় সড়ক সংকুচিত হয়ে পড়ে। এতে অন্য যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয় এবং যানজটের আশঙ্কা বাড়ে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ওয়ার্কশপের সামনে যানবাহন রাখার কারণে ওই অংশ দিয়ে চলাচলের সময় চালকদের সতর্ক থাকতে হয়। বিপরীত দিক থেকে একসঙ্গে একাধিক যানবাহন এলে সংকীর্ণ জায়গায় চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে মোটরসাইকেল, ইজিবাইক ও ছোট যানবাহনকে ঝুঁকি নিয়ে পাশ কাটাতে হয়। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে। তাদের দাবি, যানবাহন মেরামত বা বিশ্রামের প্রয়োজনে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকলেও তা মহাসড়কের চলাচলের জায়গা দখল করে হওয়া উচিত নয়। সড়কের জায়গা ছেড়ে নির্ধারিত স্থানে যানবাহন রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বকচর-হুশতলায় পুরোনো গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ব্যবসা
বকচর-হুশতলা এলাকায় পুরোনো গাড়ি কাটা এবং গাড়ির যন্ত্রাংশের ব্যবসার কারণে মহাসড়কের জায়গা ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সড়কের পাশে পুরোনো গাড়ি, খুচরা যন্ত্রাংশ, লোহার সামগ্রীসহ বিভিন্ন মালামাল রেখে ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব মালামাল মহাসড়কের সীমানার মধ্যে থাকলে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলের জায়গা কমে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকায় পুরোনো গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ব্যবসা চলছে। ব্যবসার প্রয়োজনে গাড়ি ও সরঞ্জাম সড়কের পাশে রাখা হয়। এতে মহাসড়কের জায়গা ব্যবহারের পাশাপাশি ফুটপাত ও পথচারীদের চলাচলেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। সড়কের সীমানা নির্ধারণ করে সরকারি জায়গা ব্যবহারের বিষয়টি যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। বকচর এলাকার ব্যবসায়ী আরিফ হোসেন বলেন, বগত সরকারের আমলে এখানে সবকিছু জবরদখলে ছিল বলে আমরা দেখেছি। এখন মানুষের প্রত্যাশা, সরকারি জায়গা ও মহাসড়ক সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। রাস্তার পাশে পুরোনো গাড়ি, লোহালক্কড় ও যন্ত্রাংশ পড়ে থাকলে চলাচলের জায়গা কমে যায়। পথচারীদেরও ঝুঁকি নিয়ে হাঁটতে হয়। ফুটপাত ও মহাসড়ক দখলমুক্ত করতে দায়িত্বশীলদের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া উচিত। সাধারণ মানুষ যেন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রাইভেট মাইক্রোবাসের স্ট্যান্ড নিয়েও প্রশ্ন
মনিহার-মুড়লী মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে প্রাইভেট মাইক্রোবাস দাঁড় করিয়ে রাখার বিষয়েও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, বাস ও কাভারভ্যান পার্কিংয়ের পাশাপাশি মাইক্রোবাসের স্ট্যান্ড এবং পুরোনো গাড়ি ও যন্ত্রাংশ রাখার কারণে সড়কের বিভিন্ন অংশে চলাচলের জায়গা কমে যাচ্ছে। ফলে একাধিক দিক থেকে যানবাহন এলে স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
স্থানীয়দের মতে, মহাসড়কটি শুধু শহরের যানবাহনের জন্য নয়, দূরপাল্লার যানবাহনেরও গুরুত্বপূর্ণ চলাচলপথ। এ কারণে সড়কের কোনো অংশ দীর্ঘ সময় পার্কিং বা ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহৃত হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো এলাকার যান চলাচলে। নির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা ও নিয়মিত তদারকি না থাকলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
পথচারী সজিব বলেন, বাসগুলো সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, আবার বিভিন্ন জায়গায় পুরোনো গাড়ি ও মালামাল রাখা হয়। এতে রাস্তা সংকুচিত হয়ে যায়। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে পাশ দিয়ে যেতে অনেক সময় ঝুঁকি নিতে হয়। সড়ক দিয়ে হাঁটা কিংবা রাস্তা পার হওয়াও সহজ থাকে না। আমরা চাই, মহাসড়কটি দখলমুক্ত থাকুক এবং সবাই নিরাপদে চলাচল করতে পারুক।
এ বিষয়ে যশোর পৌরসভার প্রশাসক মো. রফিকুল হাসান বলেন, আমরা দখলমুক্ত করতে বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করেছি। তাছাড়া পরিবহন ও পুরোনো গাড়ি ও যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী মালিকদেরও বারবার বলা হয়েছে জায়গা খালি করতে।
হাইওয়ে পুলিশের যশোর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. নাসিম খান বলেন, “আমরাও চাই, মহাসড়ক দখলমুক্ত হোক। তবে পৌর এলাকার মধ্যে অবস্থিত মহাসড়কগুলোর ব্যবস্থাপনায় পৌর কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। যশোর জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ ও পৌর কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে এ বিষয়ে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে হাইওয়ে পুলিশ।”
সড়কের জায়গা ব্যবহার ও পার্কিংয়ের অভিযোগের বিষয়ে যশোর ট্রফিক বিভাগের টিআই মাহফুজুর রহমান জানান, বিষয়টি পৌরসভার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এ বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, তাদের পক্ষ থেকে বাস মালিক সমিতির নেতা ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা জানান, বাস টার্মিনালের বিভিন্ন উন্নয়নকাজ চলমান থাকায় আপাতত সড়কে বাস রাখতে হচ্ছে। টার্মিনালের কাজ সম্পন্ন হলে সড়ক থেকে বাস সরিয়ে নেওয়া হবে বলেও তাঁরা জানান।
