বাংলার ভোর প্রতিবেদক
যশোরের খাজুরায় ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে মাদক কারবার। বাজারের অলিগলিসহ প্রায় প্রতিটি এলাকায় গড়ে উঠেছে মাদক স্পট। ফেনসিডিল, ইয়াবা ও গাঁজা এখন হাতের নাগালে। দিন-রাতের পার্থক্য নেই, চাইলেই সহজে মিলছে এসব মরণনেশা। ধীরে ধীরে মাদকের করাল গ্রাসের শিকার হচ্ছে যুবসমাজ ও স্কুল-কলেজেগামী শিক্ষার্থীরা। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবক ও সচেতন মহল।
অভিযোগ রয়েছে, খাজুরা পুলিশ ক্যাম্পের সহকারী ইনচার্জ রাশেদ সর্দারকে নিয়মিত মোট অঙ্কের মাসোহারা দিয়েই চলছে এই ধরনের কর্মকাণ্ড। তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ফুলে-ফুঁপে উঠেছে মাদক ব্যবসা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, খাজুরা বাজারসহ আশপাশের অন্তত ১৫টি স্পটে প্রকাশ্যে মাদক কারবার চলছে। যার ডিলার রয়েছেন ৩ জন। আর খুচরা বিক্রেতার সংখ্যা তার দশগুণ। মাদক বিক্রির উল্লেখযোগ্য স্পটের মধ্যে রয়েছে, গরুহাট বটতলা ও পাবলিক টয়লেট চত্বর, বাসস্ট্যাণ্ড-রাজাপুর রাস্তার মুখের পুকুরপাড়, তেলপাম্প আরিফ ভাটার সামনে, ভাটার আমতলা, বন্দবিলা ইউনিয়ন পরিষদ মোড়, শিবের মোড় চৌরাস্তা, জান্নাতের মোড়, ধান্যপুড়া-বন্দবিলা রাস্তা, ধর্মগাতী সাকোই বাঁশতলা ও ঘোপদুর্গাপুর খালপাড় ব্রিজ।
সূত্র জানায়, গাঁজা এক পুরিয়া ১২০ টাকা, মানভেদে ইয়াবা প্রতি পিস ২৫০-৭০০ টাকা ও ফেনসিডিল ২ হাজার ৫শ’ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা বোতল প্রতি বিক্রি হচ্ছে। এসব মাদকের পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান ৫০ টাকা থেকে শুরু করে প্রায় ৩শ’ টাকা পর্যন্ত। অল্পদিনে ধনী হওয়ার আশায় অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন অপরাধমূলক এই কারবারে।
স্থানীয়রা জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজধানীর কদমতলী থানা থেকে বদলি আবারও যশোরে আসেন এএসআই রাশেদ। তদবির বাণিজ্য করে দ্বিতীয়বার খাজুরা পুলিশ ক্যাম্পে যোগদান করেন। এর আগেও এখানে একটানা দুই-তিনবছর চাকরি করে গেছেন তিনি। সে সময় রাশেদের একটি নিজস্ব চক্র গড়ে উঠেছিল। তাদের মাধ্যমে এখন খুচরা মাদক কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা তোলা হচ্ছে। আর রাতের আঁধারে ডিলারদের থেকে নিজে টাকা তোলেন রাশেদ।
চক্রের সদস্য হিসেবে রয়েছে, পুরাতন মাদক কারবারি ও প্রভাবশালী মহলের কয়েকজন ব্যক্তি। শুধু তাই নয়; এএসআই রাশেদের বিরুদ্ধে নিরপরাধ মানুষকে মাদক দিয়ে মামলায় ফাঁসানোর একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তিনি নিজেকে বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিচয় দেন।
তার কারণে বর্তমান ইনচার্জ কয়েক মাস আগে যোগদান করা এসআই পিন্টু কুমার মণ্ডল কর্মক্ষেত্রে অনেকটা কোণঠাসা। বর্তমানে এএসআই রাশেদ যশোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) বদলির জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন এবং বদলির পর সবখানে যা খুশি তাই করতে পারবেন বলে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করছেন। তার জন্মস্থান সাতক্ষীরায় হলেও খুলনার পরিচয় দেন এবং নিজেকে ডিআইজির ভাগ্নে পরিচয় দিয়ে প্রতিনিয়ত ক্ষমতার অপব্যবহার করে যাচ্ছেন।
মাদক মামলার আসামি পারভেজ নামে এক যুবক অভিযোগ করে বলেন, ‘রাশেদ স্যার আমাকে আড়ৎপট্টি থেকে আটক করে দেহ তল্লাশি শুরু করে। আমার কাছে কিছু না পেলেও তাৎক্ষণিক তার এক সোর্স এসে রাশেদ স্যারের হাতে এক পুটলি গাঁজা দিয়ে বলেন, এটা দিয়ে চালান দিয়ে দেন।’
অর্ণব (মূল নামের সমার্থক নাম) নামে এক যুবক বলেন, ‘সন্ধ্যার দিকে খাজুরা বাজার ব্রিজঘাট থেকে এএসআই রাশেদ আমার খালাতো ভাই খাইরুল ও তার বন্ধু সুমন মাদক ছাড়াই আটক করে মামলা দেন। রাশেদ ভাই ৩০ হাজার টাকাও নিলো তবুও তাদের ছাড়েনি।’
খাজুরা বাজারের এক নৈশপ্রহরী বলেন, ‘টাকা হলে খাজুরা এলাকায় যখন তখন মাদক পাওয়া যায়। রাত জেগে কাজ করি তো; তাই একটু বাবা (ইয়াবা) খাই। এটা খেলে আর ঘুম আসেনা।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মাদক কারবারি জানান, ৫ আগস্টের পর থেকে প্রতিদিনই তার চাঁদরাত। নিয়মিত মাসোহারা দেন। প্রশাসনিক ঝক্কিঝামেলা নেই। কোনো বিশেষ বাহিনীর অভিযানের আগেই খবর পান।
জানতে চাইলে অভিযুক্ত খাজুরা পুলিশ ক্যাম্পের সহকারী ইনচার্জ রাশেদ সর্দার বলেন, ‘এসবের প্রমাণ যদি কেউ দিতে পারে তাকে পুরস্কৃত করা হবে। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের শক্ত অবস্থান।’
বাঘারপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

