বাংলার ভোর প্রতিবেদক
জীবনের পুরোটা সময় কাজ করে গেছেন মানবসেবায়। মৃত্যুর পরেও যার ব্যতিক্রম ঘটলো না। মানুষের কল্যাণে নিজের দেহটা দান করে গেছেন দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি সংস্থা জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আজাদুল কবির আজু। এক দশক আগে জীবিত অবস্থায় পরিবারের সম্মতি নিয়েই দেহ দানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি।
তার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে সব আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই যশোর মেডিকেল কলেজে দেয়া হয়েছে তার দেহ। এদিকে, মৃত্যুর পর মরণোত্তর দেহদানের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পরে প্রশংসায় ভাসছেন একজন নির্মোহ, উন্নয়নকর্মী ও মুক্তিযোদ্ধা আজাদুল কবির আজু।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা জানাযায় অংশ নিতে আসা বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষেরা বলছেন, জীবদ্দশায় তিনি যে নির্মোহ, নির্লোভের পাশাপাশি মানবসেবায় যে তার মূল্য লক্ষ্য ছিলো মৃত্যুর পরেও সেটা প্রমাণ করেছে।
আজাদুল কবির আরজু শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দুপুর একটার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগে দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। আরজু স্ত্রী ও তিন মেয়েসহ অনেক গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। এদিন আসরবাদ যশোরের কেন্দ্রীয় ঈদগা মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে সর্বস্তরের মানুষ ঈদগা মাঠে তার মরদেহে শ্রদ্ধা জানান।
মরহুম আরজুর ভাই সাংস্কৃতিক কর্মী হারুণ অর রশিদ জানান, আরজুর মেজো বোন কানাডা থেকে যশোরে আসায় জাগরণী চক্র কার্যালয়ে একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠান চলাকালে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন।
দ্রুত তাকে জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক সাকিরুল ইসলাম তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকের মতে, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। তিনি বলেন, এক দশক আগে আরজু পরিবারের মতামত নিয়েই মরণোত্তর দেহদানের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সেই কারণেই দ্রুতই তারা জানাজা শেষ করা হয়।’
আরজুর আকস্মিক মৃত্যুতে যশোরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। যশোর প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস এম তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘আরজু ছিলেন যুক্তিবাদী ও অন্তর্মুখী মানুষ।
নিজেকে সবমসময় গুটিয়ে রেখেছেন। তার মৃত্যু ও মৃত্যুর পরে তার দেহদানের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন; তিনি যে নির্মোহ নির্লোভ মানুষের পাশাপাশি মানবতার সেবায় যে তার মূল লক্ষ্য ছিলো। তার হাতে গড়া কোন সম্পদই নিজে বা তার পরিবারের জন্য রেখে যাননি।
সবকিছু ফাউণ্ডেশনে দিয়ে গেছেন। মানবতার কল্যাণে সবকিছুই যে উৎসর্গ করে যাওয়ার অন্যান্য উদাহরণ আজাদুল কবির আরজু।’ আজাদুল কবির আরজু যশোর সদর উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামে ১৯৫৩ সালের ২৮ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন।
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনীতি সচেতন তরুণ আরজু ‘সুকান্ত’র কবিতার ‘আঠারো বছর বয়সে’ একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্নে যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার সেই রণাঙ্গন থেকে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন তিনি। নির্মম অত্যাচারের পর রাজাকাররা তাকে তুলে দেয় পাকবাহিনীর হাতে। হানাদার বাহিনীর নির্যাতন সয়ে তার ঠাঁই হয় যশোর কারাগারে। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত হবার পর মুক্তি মেলে তার।
১৯৭৫ সালে আরজু কয়েকজন সমমনা বন্ধুকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন জাগরণী চক্র। যশোর শহরে শুরু করলেন ব্যবহারিক বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র। যার শিক্ষার্থী হলেন সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠী। সেই শুরু থেকে পথচলার অর্ধশত বছর পার করেছে জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন। বর্তমানে জাগরণী চক্র ফাউণ্ডেশনের প্রায় ৮ হাজার কর্মী।
দেশের ৫২ জেলায় প্রায় ১১ লক্ষ সুবিধাবঞ্চিত নারী-পুরুষ, শিশু ও প্রবীণ মানুষের সঙ্গে কাজ করছে। দারিদ্র্যমুক্ত, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে যশোর থেকে শুরু হওয়া এই প্রতিষ্ঠানটি এখন দেশের অন্যতম প্রধান বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা।
