বাংলার ভোর প্রতিবেদক
‘অর্গানোগ্রাম (টিওঅ্যান্ডই) অনুমোদন ছাড়াই ‘আইন লঙ্ঘন করে’ যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি) সহকারী রেজিস্ট্রার (লিগ্যাল) এর বিপরীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে আইন কর্মকর্তা (ল’ অফিসার)। পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ গিতে নজিরবিহীনভাবে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের যোগ্যতাকে শিথিল করা হয়েছে। লিফট স্থাপনের আগেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অপারেটর।’ নিয়োগ নিয়ে বিগত সময়ের এমন অসংখ্য অভিযোগের প্রেক্ষিতে অবশেষে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে যবিপ্রবি। তদন্ত কমিটির মাধ্যমে ‘নিয়মনীতি লঙ্খল করে অবৈধ ও অর্থবাণিজ্যের নিয়োগ’ চিহ্নিত করে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে যবিপ্রবি কর্তৃপক্ষ।
যবিপ্রবি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বিগত চার বছর ধরে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) অর্গানোগ্রাম (টিওঅ্যান্ডই) অনুমোদন ছাড়াই একের পর এক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের মহোৎসব চলেছে। এসব নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও অর্থবাণিজ্যের অভিযোগও ছিল বিস্তর। ‘পছন্দের প্রার্থী’কে নিয়োগ দিতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেও অনিয়ম করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বের অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম ২০১৯-২০ অর্থবছরে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায়। এরপর যবিপ্রবি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) নতুন প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রাম অনুমোদনের জন্য জমা দেন। ইউজিসি প্রস্তাবিত পর্যালোচনা করে সুপারিশসহ প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে প্রেরণ করে। এরপর প্রস্তাবিত সংশোধিত অর্গানোগ্রামটি যবিপ্রবি উপাচার্য বরাবর ফেরত পাঠানো হয়। ফলে অর্গানোগ্রাম অনুমোদন ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারী পদে নিয়োগ প্রদানের সুযোগ নেই। কিন্তু তারপরও বিগত সময়ে যবিপ্রবিতে একের পর এক কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে।
সূত্র অনুযায়ী, গত ২২ আগস্ট’২৩ যবিপ্রবিতে ‘ল অফিসার’ হিসেবে একজনকে নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও যোগদানপত্র অনুযায়ী তাকে সহকারী রেজিস্ট্রার (লিগ্যাল) পদের বিপরীতে অস্থায়ী নিয়োগ দেখানো হয়। ওই পদে নিয়োগপ্রাপ্ত মাহমুদ আশরাবী নিশান’র পিতা যবিপ্রবি রেজিস্ট্রারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং যবিপ্রবির লিগ্যাল এডভাইজার। সহকারী রেজিস্ট্রার (লিগ্যাল) পদে তার নিয়োগ দেয়া সম্ভব নয় বলে তার যোগ্যতা অনুযায়ী পদ নির্ধারণ করে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও রেজিস্ট্রারের আপন ভাইপো, ভাগ্নি, মামাতো বোনসহ বেশকিছু আত্মীয় স্বজন ও পরিচিত জনদের নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিগত সময়ে সর্বশেষ দুই উপাচার্য নিয়োগ আপগ্রেডেশন ও প্রমোশনে নিজেদের খেয়াল খুশি মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই ক্ষেত্রে পছন্দ মতো রিজেন্ট বোর্ড ছিলো সব অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করার প্রধান অস্ত্র। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন কর্মকর্তা ( ল’ অফিসার) নিয়োগেই আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রসঙ্গে- ল অফিসার মাহমুদ আশরাবী নিশান বলেন, অর্গানোগ্রাম অনুমোদন বা নিয়ম লঙ্ঘনের বিষয়টি তার জানার কথা নয়। আর নিয়োগে কোনো ধরণের আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। এ ব্যাপারে বক্তব্যের জন্য যবিপ্রবি রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী আহসান হাবীব একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। বক্তব্যের জন্য ক্ষুদে বার্তা দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এছাড়া বিগত সময়ে যবিপ্রবি’র ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন বিভাগের প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘নজিরবিহীনভাবে’ উচ্চমাধ্যমিকের যোগ্যতাকে শিথিল করা হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী উচ্চমাধ্যমিকে নূন্যতম ‘এ’ গ্রেড বা প্রথম বিভাগ থাকার কথা। সেখানে আন্তর্জাতিক ট্রেনিংকে যোগ্যতা গণ্য করে উচ্চমাধ্যমিকে ছাড় দেয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী যোগ্যপ্রার্থী বাছাই করা হয়নি; বরং মনোনীত প্রার্থীর যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া লিফটের জন্য ১৪টি লিফট অপারেটর নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ১১ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। সবগুলো লিফট স্থাপনের আগেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কর্তৃপক্ষ। তারমান বিবি হল ও মুন্সী মেহেরুল্লাহ হল চালু না হলেও সেকশন অফিসার নিয়োগ প্রদান করা হয়। নিয়োগপ্রাপ্ত দুই কর্মকর্তা’র একজন যবিপ্রবি’র এক শীর্ষ কর্মকর্তার ভাইপো, অন্যজন ছাত্রলীগ নেতা।
সূত্র আরও জানায়, যবিপ্রবিতে এর আগেও একাধিক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক ও অভিযোগ রয়েছে। অবৈধভাবে নিয়োগের মাধ্যমে ৬১ লাখ ৩১ হাজার ৭৩২ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৩ সালের গত ২১ আগস্ট যবিপ্রবি’র প্রাক্তন উপাচার্য, যবিপ্রবির পূর্ত দপ্তরের উপপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. আব্দুর রউফসহ তিনজনের বিরুদ্ধে যশোর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের অধীনে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) যশোর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলাও করেছে দুদক। যবিপ্রবি’র এই ‘লাগামহীন নিয়োগ-অনিয়ম ও বাণিজ্যের’ বিষয়টি আমলে নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এজন্য পূর্ববর্তী সময়ের নিয়োগ অনিয়ম তদন্তে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রিজেন্ট বোর্ড। যবিপ্রবি’র প্রথম উপাচার্য প্রফেসর ড. রফিকুল ইসলাম সরকারকে প্রধান করে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।
যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মজিদ তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বিগত সময়ের অনেক বিষয় নিয়েই অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও সুপারিশের উপর ভিত্তি করে বিগত সময়ের নিয়োগ-অনিয়মের ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।