বাংলার ভোর প্রতিবেদক
ধান, পাট, গম কিংবা সবজি চাষের তুলনায় আখ চাষে লাভ বেশি। উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম, আবার বাজারেও রয়েছে চাহিদা। এক বিঘা জমিতে আখ চাষ করে খরচ বাদে দেড় লাখ থেকে প্রায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ করছেন কোনো কোনো কৃষক। ফলে অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি যশোরের বাণিজ্যিকভাবে আখ চাষে ঝুঁকছেন কৃষকেরা। গত সাত বছরে জেলায় আখের আবাদ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। তবে সম্ভাবনাময় এই ফসলের আবাদ আরও সম্প্রসারণে সরকারি সহযোগিতা ও প্রণোদনা চান কৃষকেরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যশোরের ২০২০ সালে ১৭৫ হেক্টর, ২০২১ সালে ১৯০ হেক্টর, ২০২২ সালে ২১৫ হেক্টর, ২০২৩ সালে ৩০০ হেক্টর, ২০২৪ সালে ২৯৫ হেক্টর, ২০২৫ সালে ৩২০ হেক্টর এবং চলতি ২০২৬ সালে ৩৫০ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছে। উৎপাদিত এই আখের আনুমানিক বার্ষিক গড় বাজারমূল্য ২৫ কোটি টাকা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার বাঘারপাড়া, শার্শা, মণিরামপুর, কেশবপুর ও ঝিকরগাছা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আখের আবাদ হচ্ছে। বিশেষ করে বাঘারপাড়ায় আখ চাষের বিস্তার বেশি। এখানকার মিষ্টি ও লম্বা আখের চাহিদা রয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে এসব আখ ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
বাঘারপাড়া উপজেলার হাবুল্লা গ্রামের কৃষক জিয়াউল হক বলেন, ‘বর্তমানে আখ চাষের চেয়ে লাভজনক ফসল আর নেই। ধান, পাট, গম, ভুট্টা ও বিভিন্ন সবজি চাষের তুলনায় আখে তিন থেকে চার গুণ বেশি লাভ হচ্ছে। আমি এক বিঘা জমিতে আখ চাষ করে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা খরচ করেছি। বিক্রি করেছি দুই লাখ ৬০ হাজার টাকায়। অন্যান্য ফসলের তুলনায় আখ চাষে লাভ বেশি হওয়ায় এ অঞ্চলের অনেক কৃষক এখন আখ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। প্রতি বছর যেভাবে আবাদ বাড়ছে, তাতে যশোরে আখ চাষের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন সরকারি সহযোগিতা।’
একই গ্রামের কৃষক নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘চাকরির পেছনে না ঘুরে মাত্র পাঁচ কাঠা জমিতে আখ চাষ শুরু করেছিলাম। এখন আমার দুই বিঘা জমিতে আখ রয়েছে। এক বিঘা জমিতে চাষ, বীজ ও সার বাবদ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সেই জমির আখ পাইকারি বিক্রি করেছি আড়াই লাখ টাকায়। সব খরচ বাদে বিঘাপ্রতি দেড় লাখ টাকা লাভ হয়েছে।’
জেলার আট উপজেলার মধ্যে বাঘারপাড়ায় সবচেয়ে বেশি আখের আবাদ হচ্ছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত সীমান্তঘেঁষা শার্শা উপজেলা। এ ছাড়া মণিরামপুর, কেশবপুর ও ঝিকরগাছার পলিযুক্ত উঁচু জমিতে আখের ভালো ফলন হচ্ছে। এসব এলাকায় গান্ডারি, লিপিস্টিক সুন্দরী, চায়না লাল সুন্দরী, ঈশ্বরদী-১ ও অমৃতসহ বিভিন্ন জাতের মিষ্টি আখের চাষ করছেন কৃষকেরা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, যশোরে আখ চাষের উপযোগী মাটি ও আবহাওয়া রয়েছে। সাধারণত শরৎকালে, আশ্বিন থেকে কার্তিক মাসে আখ রোপণ বেশি হয়। এ ছাড়া ফাল্গুন থেকে চৈত্র মাসেও আখ রোপণ করা যায়। রোপণের পর আখ পরিপক্ব হতে সাধারণত ১০ থেকে ১২ মাস সময় লাগে। দীর্ঘমেয়াদি এই ফসলের জমিতে বাড়তি আয় করতে কৃষকেরা আখের সারির ফাঁকা জায়গায় ডাল, সরিষা ও বিভিন্ন শাকসবজির মতো সাথী ফসল চাষ করছেন।
বাঘারপাড়া উপজেলার হাবুল্লা গ্রামের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, পাশাপাশি বিস্তীর্ণ জমিতে আখের আবাদ হয়েছে। কোনো কোনো জমির আখ কাটা শেষ হয়েছে, কোথাও কাটার প্রস্তুতি চলছে। আবার কোনো জমিতে নতুন করে আখ রোপণ করা হয়েছে। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লাভের আশায় অনেকেই নতুন করে আখ চাষে যুক্ত হচ্ছেন।
যশোর শহরের খালধার রোড, যা আখের হাট হিসেবে পরিচিত, সেখানেও প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আখ কেনাবেচা হয়। আখ ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম বলেন, ‘এখানে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার পিস আখ আসে। আকারভেদে প্রতিটি আখ ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। এতে ভালো লাভ থাকে। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এখানকার আখ খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলে যায়।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, যশোরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. জাহিদুল ইসলাম বিশ্বাস বলেন, ‘ভালো মাটি, আশানুরূপ ফলন, রোগবালাই কম এবং অন্যান্য ফসলের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি লাভের কারণে যশোর অঞ্চলে আখের আবাদ বাড়ছে। আখের সারির মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় ডাল, সরিষা ও শাকসবজির মতো সাথী ফসল চাষের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকদের কারিগরি প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। এতে সাথী ফসল থেকে উৎপাদন খরচের বড় অংশ উঠে আসে, আর আখ বিক্রির টাকা থেকে কৃষকের লাভের পরিমাণ বাড়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যশোরের আট উপজেলার মধ্যে তিন থেকে চারটি উপজেলায় আখের আবাদ বেশি হচ্ছে। তবে এখনো ব্যাপকভাবে আখের চাষ না হওয়ায় আখচাষিদের জন্য আলাদা কোনো সরকারি বরাদ্দ নেই। ভবিষ্যতে প্রয়োজনের ভিত্তিতে এ ধরনের সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।’
