জাহিদুল কবির মিল্টন ও কামরুজ্জামান টিটু
যশোর শহরের ঘোপ জেলরোড বাইলেনের মুচিপাড়া রোড (বউবাজার) এলাকায় নকশা অনুমোদন ছাড়াই বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। প্রস্তাবিত ৯ তলা ভবনটির নির্মাণকাজ ঘিরে আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ না করে ভবন নির্মাণ করা হলে আশপাশের স্থাপনা ও বাসিন্দারা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। এ ঘটনায় এলাকাবাসী যশোর পৌরসভায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই ভবনটির চারতলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে। তবে ভবনটির অনুমোদনসংক্রান্ত নথিপত্র ও নির্মাণকাজের বৈধতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
যশোর জেলা বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন কমিটির সদস্যসচিব জাহিদুল ইসলাম জানান, সাততলা পর্যন্ত ভবনের নকশা অনুমোদনের দায়িত্ব পৌরসভার। এর বেশি উচ্চতার ভবনের ক্ষেত্রে জেলা বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন। জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে গঠিত এ কমিটিতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। আবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নকশা যাচাই করে অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
তিনি বলেন, অনুমোদন পাওয়ার আগে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা বিধিসম্মত নয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘোপ জেলরোড বাইলেনের মুচিপাড়া রোডের বউবাজার এলাকায় ভবনটির নির্মাণকাজ চলছে। স্থানীয়দের দাবি, নকশা অনুমোদনের আগেই চারতলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে পৌরসভায় লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন তারা। তবে অভিযোগের পর পৌর কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে জমির শ্রেণি, রাস্তার প্রশস্ততা, ভবনের উচ্চতা, নির্ধারিত খোলা জায়গা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং কাঠামোগত নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়ার বিধান রয়েছে। বিশেষ করে বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও কারিগরি শর্ত পূরণ গুরুত্বপূর্ণ। এসব শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ধাপ-১ :
পরিকল্পনা অনুমোদন ভবন নির্মাণের জন্য এটি প্রথম ও প্রাথমিক অনুমতি। জমির মালিকানা সংক্রান্ত মূল কাগজ এবং ডিজিটাল সার্ভে ম্যাপ দিয়ে আবেদন করতে হয়। বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন কমিটি (বিসি কমিটি) পরিকল্পনা বিভাগ জমিটি আবাসিক, বাণিজ্যিক নাকি অন্য কোনো ব্যবহারের উপযোগী,তা যাচাই করে এই ছাড়পত্র দেয়।
ধাপ-২ :
নির্মাণ পরিকল্পনা অনুমোদন পাওয়ার পর নির্দিষ্ট আর্কিটেক্ট ও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা প্রস্তুতকৃত নকশা দিয়ে নির্মাণ অনুমোদনের আবেদন করতে হয়।
ধাপ-৩ :
বসবাস বা ব্যবহার সনদ ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পর কর্মকর্তারা এসে নকশা অনুযায়ী ঠিকঠাক কাজ হয়েছে কিনা তা পরিদর্শন করেন। এরপরই ভবনে বসবাসের বা ব্যবহারের বৈধ সার্টিফিকেট দেয়া হয়। বহুতল ভবনের জন্য বিশেষ শর্ত যদি প্রস্তাবিত ভবনটি ১০ তলার বেশি বা বিশেষ কোনো প্রজেক্ট হয়, তবে চূড়ান্ত ইমারত নির্মাণ অনুমোদনের আগে দেশের ৯টি ভিন্ন সংস্থা থেকে ছাড়পত্র বা অনাপত্তিপত্র নেয়া বাধ্যতামূলক,
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স (অগ্নি নিরাপত্তা ছাড়পত্র) পরিবেশ অধিদপ্তর (পরিবেশগত ছাড়পত্র), (বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান) বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ভবনের উচ্চতা অনুযায়ী প্রযোজ্য হলে। ভূগর্ভস্থ মাটির পরীক্ষার রিপোর্ট এবং পাইল ফাউন্ডেশনের জন্য প্রয়োজনীয় ইনডেমনিটি বন্ড। পৌরসভা ও অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন এলাকার প্রক্রিয়া দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পৌরসভা এলাকায় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষ নকশা অনুমোদন করে।
সুউচ্চ ভবন কমিটি :
জেলা বা পৌরসভা পর্যায়ে সাধারণ ভবনের নকশা পৌর ইঞ্জিনিয়াররা পাশ করলেও বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে ‘জেলা সুউচ্চ ভবনের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ ও নকশা অনুমোদন সংক্রান্ত কমিটি’’র কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি নিতে হয়।
পৌরসভার মাস্টারপ্ল্যান :
জমির লে-আউট পৌরসভার মাস্টারপ্ল্যানের সড়ক বা ড্রেনেজ ব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক কিনা তা কঠোর ভাবে যাচাই করা হয়। বহুতল ভবনের প্রধান টেকনিক্যাল নিয়মকানুন অনুযায়ী ভবনের উচ্চতা এবং আয়তন নির্ধারণে নিচের নিয়মগুলো মানা বাধ্যতামূলক: (ফ্লোর এরিয়া রেশিও) মোট জমির আয়তনের তুলনায় কত তলা বা কত স্কয়ার ফিট ভবন নির্মাণ করতে পারবেন, তা এই অনুপাত দিয়ে নির্ধারিত হয়। এলাকাভিত্তিক এর মান ভিন্ন হয়ে থাকে। সেটব্যাক ইমারত বিধিমালা অনুযায়ী ভবনের সম্মুখভাগ, পশ্চাৎভাগ এবং দুই পাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা রাখা বাধ্যতামূলক। ১০ তলা বা তার বেশি ভবনের ক্ষেত্রে এই ফাঁকা জায়গার পরিমাণ সাধারণ ভবনের চেয়ে অনেক বেশি রাখা হয় যেন ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরতে পারে।
রাস্তার প্রশস্ততা :
ভবনের সামনের রাস্তার চওড়া বা প্রশস্ততার ওপর ভিত্তি করে ভবনের সর্বোচ্চ উচ্চতা নির্ধারিত হয়। রাস্তা খুব সরু হলে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন পাওয়া যায় না। এ সব নিয়মনীতি না মেনেই প্লান পাশ বা অনুমোদনের আগেই ঘোপ জেল রোড বাইলেন মুচিপাড়া রোডে (বউবাজার) বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।
যশোর জেলা বিল্ডিং কনসট্রাকশন কমিটির সদস্য সচিব জাহিদুল ইসলাম জানান, ৭ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণের প্লান পৌরসভা পাস করে। ৭ তলার বেশি হলে ১০ সদস্য বিশিষ্ট জেলা বিল্ডিং কনসট্রাকশন কমিটি অনুমোদন দেয়। এই কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক। অন্য সদস্যরা হলেন এলজিইডির প্রতিনিধি, জেলা পরিষদের প্রতিনিধি, পৌরসভার প্রতিনিধি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিনিধি, ম্যানেজার যশোর এয়ারপোর্টের প্রতিনিধি, স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি ও নগর উন্নয়নের প্রতিনিধি। ১০ সদস্যের কমিটির কাছে আবেদন করার পর যাচাই বাছাইয়ের পর সব কিছু সঠিক থাকলে প্লান পাস বা অনুমোন দেয়া হবে। প্লান পাসের আগে কোন ভাবে ভবন নির্মাণের কাজ করা অবৈধ বা বেআইনী।
এলাকাবাসীর আশঙ্কা, ভবনটির নির্মাণকাজে অনুমোদিত নকশা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত অনুসরণ না করা হলে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই নির্মাণকাজের বৈধতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তারা।
এ বিষয়ে ভবনের দুই অংশীদার ডা. হাদিউজ্জামান ও ডা. সফিউল আলমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। ফলে ভবনটির অনুমোদন ও নির্মাণসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসীর দাবি, অভিযোগটি দ্রুত তদন্ত করে ভবনটির অনুমোদন, নির্মাণ নকশা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়গুলো যাচাই করা হোক। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া নির্মাণকাজ হয়ে থাকলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
