হিমেল খান
যশোর পৌরসভার আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রটি এখন জনভোগান্তি ও পরিবেশের জন্য এক বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। প্রায় ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দ্য স্কেট লিমিটেডের কাছে লিজ দেয়া হলেও, যথাযথ পরিচালনা ও তদারকির অভাবে প্লান্টটি কর্যত অচল হয়ে পড়েছে। একদিকে বাসা-বাড়ির বর্জ্য অপরদিকে হাসপাতালের বর্জ্য এক সাথে মিশে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা তৈরি করেছে দেশের প্রথম আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রটি। ফলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে এ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে বলে শংকা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় জনসাধারণ ও স্বাস্থ্য বিভাগ।
যশোর শহরতলীর হামিদপুরে প্রায় ১৪ একর আয়তনের যশোর পৌরসভার ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্লান্টটি দেশের প্রথম আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র হিসেবে স্থাপিত হয়। প্রকল্পটির মাধ্যমে জৈব সার, বায়োগ্যাস এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করার কথা ছিলো। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা হওয়ার কথা ছিল, অন্যদিকে পৌরসভার আয় বাড়ার সম্ভবনাও তৈরি হয়েছিলো। কিন্তু বাস্তব ছিত্র পুরোপুরি ভিন্ন।
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, লিজ দেয়ার পর থেকেই প্লান্টটির কার্যক্রম ধীরে ধীরে ভেঙ্গে পড়ে। নিয়মিত বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ না হওয়ায় প্লান্টের ভেতরে জমে আছে পাহাড়সম বর্জ্যরে স্তুপ। বাসা বাড়ির সাধারণ বর্জ্যরে সঙ্গে হাসপাতালের ঝুঁকিপূর্ণ মেডিকেল বর্জ্য একসঙ্গে ফেলা হচ্ছে, পরিবেশের ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে।
যশোর সরকারি এমএম কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ছোলজার আহমেদ বলেন, পৌরসভা যে লক্ষ্য নিয়ে এটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাটি তৈরি করেছিলো তা পূরণ করতে পারেনি। বরং এখন এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পটি যে অবস্থায় রয়েছে তা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষা মৌসুম এলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে পানি জমে ময়লা আবর্জনার সাথে মিশে আশেপাশের অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এতে এ অঞ্চলের মানুষের যেমন স্বাস্থ’্যঝুঁকি বাড়ছে তেমনি পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দার বলছেন, প্লান্ট এলাকা থেকে দিন রাত তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বাতাসে সেই দুর্গন্ধ ছড়িয়ে আশেপাশের বসতিগুলোতে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়ষ্কদের মধ্যে বিভিন্ন শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগের উপসর্গ দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মেডিকেল বর্জ্য আলাদা প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি না করলে তা থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু এখানে সেই নিয়মই মানা হচ্ছে না। ফলে পুরো এলাকা স্বাস্থ্যঝুঁকির কেন্দ্র হিসেবে পরিণত হচ্ছে।
এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগও এ ব্যাপারটি নিয়ে শঙ্কিত। যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, বর্তমান অবস্থা খুবিই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে বর্জ্যরে দূষিত তরল আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে চর্মরোগ, ডায়রিয়াসহ মরণব্যাধি এইডস এর মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আসন্ন বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে স্থানীয়দের উদ্বেগ আরো বেড়েছে। কারণ বৃষ্টির পানির সঙ্গে বর্জ্যরে তরল অংশ প্ল্যান্ট এলাকা থেকে বের হয়ে পাশের জমি ও বসতিতে ঢুকে পড়ে। এতে শুধু পিিরবেশ দূষণই নয়, কৃষিজমিরও ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে যশোর পৌরসভার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে,তারা পরিস্থিতি উন্নয়নে কাজ করছে। পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মোরাদ আলী জানান, লিজ গ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের সাথে নিয়েমিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তাদের যে শর্তে লিজ দেয়া হয়েছিলো সেটি তারা পূরণ করতে পারেনি। এ কারণে বিকল্প চিন্তা করছেন তারা।
এক সময় দক্ষিণ এশিয়ার মডেল হিসেবে পরিছিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রটি এখন অব্যবস্থাপনা, ঘাফিলতি ও দায় এড়ানোর প্রতীকে পরিণত হয়েছে। যে প্রকল্প থেকে পরিবেশবান্ধব জ¦ালানি ও সার উৎপাদনের স্বপ্ন দেখা হয়েছিলো, সেটি এখন স্বাস্থ্যঝুঁকির উৎস।
