বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
রাত বাড়লেই জমজমাট যশোরের চৌগাছার ঐতিহ্যবাহী বলুহ মেলা। জেলা প্রশাসনের অনুমতি অনুযায়ী প্রতিদিন রাত ৮টার মধ্যে মেলা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের পরও গভীর রাত পর্যন্ত চলছে মেলার কার্যক্রম। এরই মধ্যে মেলার আশপাশে অনলাইন জুয়া, মাদক সেবন ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। কপোতাক্ষ নদের পাড় ও নদীসংলগ্ন বাঁশবাগানকে ঘিরে এসব কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। শুধু তা-ই নয়, বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় উচ্চ শব্দে মাইক, রাইড ও স্টল বসানো এবং খোলা পরিবেশে অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী এ মেলা আনন্দ-উৎসবের পাশাপাশি জননিরাপত্তা, শিক্ষার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
চৌগাছা উপজেলার হাজরাখানা গ্রামে কপোতাক্ষ নদের তীরে পীর বলুহ দেওয়ানের রওজা শরিফকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে এ মেলার আয়োজন হয়ে আসছে। প্রতিবছর মেলাকে কেন্দ্র করে চৌগাছাসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলার মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। চলতি বছরও ১৫ দিনের জন্য মেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে মেলার অনুমতিপত্রে ১৯টি শর্ত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মেলা শুরুর পর থেকেই এসব শর্ত মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে মেলার মাঠ ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সন্ধ্যার পর দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেলার বিভিন্ন অংশে উচ্চ শব্দে সাউন্ড সিস্টেম ও আলোকসজ্জা চলছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেলার ব্যস্ততাও বাড়ছে। অথচ অনুমোদিত সময়ের পর মেলা চালু রাখার অভিযোগ রয়েছে।
নদীর পাড়ে জুয়া-মাদক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ
মেলার মাঠের পাশেই কপোতাক্ষ নদের পাড় ও নদীসংলগ্ন বাঁশবাগান এলাকায় নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা। তাদের দাবি, রাতের দিকে এসব এলাকায় তরুণদের আড্ডা, মাদক সেবন এবং অনলাইন জুয়ার মতো কর্মকাণ্ড চলে।
মেলায় ঘুরতে আসা লায়লা খানম বলেন, বাচ্চাদের জোরাজুরিতে তিনি মেলায় এসেছেন। বাথরুমে যাওয়ার জন্য নদীর পাড়ে তৈরি অস্থায়ী বাথরুমের কাছে গিয়ে তরুণ-তরুণীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে দেখেছেন বলে দাবি করেন তিনি। এমন দৃশ্য দেখে তিনি বিব্রত হন।
তার স্বামী ইউনুস মিয়া বলেন, নদীর পাড়ে অল্প বয়সী ছেলেদের বসে অনলাইন জুয়া খেলতেও দেখা গেছে।
ওরশ ও মেলা পরিচালনা কমিটির সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ‘জানেন তো ভাই, রাতেই মেলা জমে বেশি। আর এক জায়গায় অনেক মানুষ থাকলে কিছু দুষ্টু ছেলে-মেয়ে তার মধ্যে থাকে। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি এসব বন্ধ করার জন্য।’
চৌগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ মামুনুর রশিদ বলেন, ‘জুয়া, মাদক ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নেবে। আমরা চেষ্টা করব এগুলো বন্ধ করতে।’
চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ইসলাম বলেন, মেলায় নির্ধারিত সময়ের পর কার্যক্রম চালানো এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের বিষয়টি তার জানা ছিল না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে মেলা কমিটিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘মেলার অনুমতিপত্রে যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছে, সেগুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। জুয়া, মাদক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ কোনো ধরনের অপকর্মের সুযোগ দেওয়া হবে না।’
স্কুলের ছাদে মাইক, ব্যাহত শ্রেণিকার্যক্রম
মেলার কারণে হাজরাখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের ছাদে মাইকের হর্ন স্থাপন এবং বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় রাইড ও স্টল বসানোর অভিযোগের কথা সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের আশপাশে মেলার বিভিন্ন স্থাপনা ও রাইড বসানো হয়েছে। উচ্চ শব্দে মাইক বাজানো হচ্ছে। বিদ্যালয়ের ছাদে মাইকের হর্ন স্থাপন এবং নিচে জেনারেটর ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এ নিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
হাজরাখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আলিফ, আয়ান ও রাগীব বলে, স্কুলের ছাদে মাইক লাগিয়ে সারাক্ষণ শব্দ করা হচ্ছে। এতে ক্লাস করতে সমস্যা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মেলার কারণে প্রতিবছরই বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
অস্বাস্থ্যকর খাবারে স্বাস্থ্যঝুঁকি
মেলার মাঠজুড়ে রয়েছে অসংখ্য খাবারের দোকান। সন্ধ্যার পর এসব দোকানে ক্রেতার ভিড়ও বাড়ছে। তবে অধিকাংশ দোকানেই খাবার ঢেকে রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই বলে দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, খোলা অবস্থায় রাখা হয়েছে ফাস্টফুড, রান্না করা চিকেন, শরবত, জুস ও ফালুডাসহ বিভিন্ন খাবার। কোথাও খাবারের ওপর ধুলাবালি পড়ছে, আবার কোথাও খাবারের পাত্রের আশপাশে মাছি উড়তে দেখা যায়। রান্না করা খাবার ও কাঁচা উপকরণও পাশাপাশি রাখা হয়েছে।
দর্শনার্থীদের অভিযোগ, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মেলায় এলে খাবারের দোকানে যেতেই হয়। কিন্তু খাবার তৈরির পরিবেশ ও সংরক্ষণের পদ্ধতি দেখে বিশেষ করে শিশুদের খাবার নিয়ে তারা শঙ্কিত।
দর্শনার্থী আনিসুর রহমান বলেন, ‘মেলায় এসে শিশুরা খাবার খেতে চায়। কিন্তু যেভাবে খোলা অবস্থায় খাবার রাখা হচ্ছে, তাতে অসুস্থ হওয়ার ভয় থাকে। খাবারগুলো ঢেকে রাখা এবং দোকানগুলোর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা দরকার।’
রাবেয়া খাতুন নামে আরেক দর্শনার্থী বলেন, ‘চিকেন ও ফাস্টফুড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তার ওপর মাছি বসছে, ধুলাবালি পড়ছে। এগুলো দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি থাকা উচিত।’
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, খোলা পরিবেশে খাবার রাখলে ধুলাবালি ও মাছির মাধ্যমে জীবাণু খাবারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় খোলা অবস্থায় থাকলে খাদ্যদূষণের ঝুঁকি বাড়ে। এতে ডায়রিয়া, বমি ও পেটের বিভিন্ন অসুস্থতা দেখা দিতে পারে।
যশোর জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা আব্দুর রহমান বলেন, ‘মেলায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার বিক্রির বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আজ (শুক্রবার) সেখানে আমাদের একটি টিম পাঠানো হবে। একই সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় অভিযান পরিচালনার ব্যবস্থা করা হবে।’
নিম্নমানের পণ্যের অভিযোগ
মেলার বিভিন্ন স্টলে জুতা, কাপড়, কম্বল, কসমেটিকসসহ নানা ধরনের পণ্য বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্যের মান ও বিশেষ করে কসমেটিকসের মেয়াদ নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
ক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দেখতে ভালো লাগায় জুতা কিনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু হাতে নিয়ে দেখার পর মনে হয়েছে মান খুব একটা ভালো নয়। দামও দোকানভেদে ভিন্ন ভিন্ন চাওয়া হচ্ছে।’
সুমি আক্তার নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘বেশিরভাগ কসমেটিকসের মেয়াদ বা উৎপাদনের তারিখ অস্পষ্ট। মেলায় এসে অনেকে যাচাই না করেই কিনছেন। এতে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা আছে।’
ক্রেতাদের দাবি, মেলায় বিক্রি হওয়া পণ্যের মান, মূল্য এবং বিশেষ করে কসমেটিকসের মেয়াদ যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, যশোর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সেলিমুজ্জামান জানান, বিষয়টি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
ঐতিহ্য রক্ষায় নজরদারি চান স্থানীয়রা
স্থানীয়দের কাছে বলুহ মেলা শুধু একটি বাণিজ্যিক আয়োজন নয়; এটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও সামাজিক উৎসবের অংশ। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন এবং হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে।
তবে মেলার এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে অনুমোদনের শর্ত মেনে চলা, নির্ধারিত সময়ের পর মেলা বন্ধ করা, জুয়া-মাদক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধে কঠোর নজরদারি এবং নিরাপদ খাবার ও পণ্যের মান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাদের মতে, প্রশাসন ও মেলা পরিচালনা কমিটির সমন্বিত নজরদারি থাকলে ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজন যেমন নিরাপদ থাকবে, তেমনি পরিবার-পরিজন নিয়ে আসা দর্শনার্থীরাও স্বস্তিতে মেলা উপভোগ করতে পারবেন।

স্কুলের ছাদে মাইক, ব্যাহত শ্রেণিকার্যক্রম
অস্বাস্থ্যকর খাবারে স্বাস্থ্যঝুঁকি
নিম্নমানের পণ্যের অভিযোগ