মুর্শিদা পারভিন, রামপাল :
চারপাশে মাছের ঘের। মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা জরাজীর্ণ একটি ভবন। ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, দেয়ালজুড়ে বড় বড় ফাটল। সামান্য বৃষ্টি হলেই শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে যায়। কখনো কখনো বই-খাতা বাঁচাতে শিক্ষার্থীদের টেবিলের ওপর উঠে থাকতে হয়। এমনই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে চলছে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার মুজিবনগর চর (বাঁশতলী) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান।
শুধু এই বিদ্যালয় নয়, রামপাল উপজেলার ১২৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৯টিকে অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে প্রায় ১ হাজার ৭৭০ শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পড়াশোনা করছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো অপসারণ করে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চাহিদাপত্র পাঠানো হলেও এখনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।
বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভবনগুলোর সংস্কার না হওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ হচ্ছে। যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতেও অনীহা প্রকাশ করছেন।
১৯ বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, রামপালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১২৭টি। এর মধ্যে ১৯টি বিদ্যালয় অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ। কয়েকটি বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করা হলেও আরও বেশ কিছু ভবন এখন সংস্কারেরও অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে দ্বিজবর মল্লিক মেমোরিয়াল হাতীরবেড় সুলতানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সগুনা দক্ষিণপাড়া, তালবুনিয়া উত্তরপাড়া, মুজিবনগর চর (বাঁশতলী), পূর্ব বাঁশতলী উত্তরপাড়া, বিএস কুইন্টন, বর্ণি ছায়ারাবাদ, সন্ন্যাসী তালুকদারপাড়া, বাঁশতলী, রণসেন আদর্শ, বেতকাটা-২, ফুলপুকুরিয়া পেড়িখালী, ধলদাহ হাজী সাহেব আলী, গৌরম্ভা দক্ষিণপাড়া, বৈরভাঙ্গা, গৌরম্ভা পূর্বপাড়া, ইসলামাবাদ দক্ষিণপাড়া, বড় নবাবপুর ও গোবিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
ভবনে ফাটল, ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা
সরেজমিনে কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ছাদ ও দেয়ালে বড় বড় ফাটল রয়েছে। কোথাও দেয়াল থেকে মরিচা ধরা রড বেরিয়ে এসেছে। আবার কোথাও ছাদ থেকে বালি ও সিমেন্টের গুঁড়া খসে পড়ছে। কিছু ভবনের ফাটল ঠেকাতে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে সাময়িকভাবে ঠেকনা দেওয়া হয়েছে।
মুজিবনগর চর (বাঁশতলী) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের অবস্থাও নাজুক। বৃষ্টির পানি চুইয়ে শ্রেণিকক্ষ ভিজে যায়। ফলে বই-খাতা ও শিক্ষা উপকরণ রক্ষায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়। বিদ্যালয়ের পুরোনো চেয়ার-টেবিলও অনেকটা ভাঙাচোরা।
কয়েকটি বিদ্যালয়ে স্থায়ী ভবন না থাকায় গোলপাতা ও টিনের অস্থায়ী ছাউনির নিচে পাঠদান চলছে। প্রচণ্ড রোদে টিনের ছাউনির নিচে অসহনীয় গরমে শিশুদের ক্লাস করতে হচ্ছে। আবার বৃষ্টির সময় পানি ঢুকে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
আতঙ্কে শিক্ষক-শিক্ষার্থী
মুজিবনগর চর (বাঁশতলী) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাওলাদার জাকির ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জোড়াতালি দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে শিশুদের পাঠদান করাতে হচ্ছে। প্রতিদিন পড়ানোর চেয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি চিন্তায় থাকতে হয়। দ্রুত ভবনটি অপসারণ করে নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাহুল দাস, শামীমা খাতুন, আদনান রহমান ও তানিহা খাতুন জানায়, ভবনের ছাদ ও দেয়াল থেকে প্রায়ই বালি-সিমেন্ট খসে পড়ে। মাঠে পানি জমে থাকায় খেলাধুলাও করা যায় না। টিনের ছাউনির নিচে প্রচণ্ড গরমে ক্লাস করতে কষ্ট হয়। নতুন ভবন হলে বিদ্যালয়ে আসতে তাদের আরও ভালো লাগবে।
সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় অভিভাবকদের
অভিভাবকরা জানান, সন্তানদের ভালোভাবে পড়াশোনা করানো তাদের প্রত্যাশা। কিন্তু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তা হতে পারে না। পুরোনো ভবনের ছাদ ও দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ায় যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। বৈরি আবহাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
তাদের ভাষ্য, দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ না হলে অনেকে সন্তানদের এসব বিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন। এতে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হবে।
ঝুঁকির কারণে কমছে শিক্ষার্থী
একাধিক শিক্ষক জানান, বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই পাঠদান চালাতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে শিক্ষার্থীদের চোখের সামনেই ছাদ বা দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে। এতে শিক্ষকরা আতঙ্কে থাকেন এবং পাঠদানেও মনোযোগ ব্যাহত হয়।
শিক্ষকদের দাবি, বিদ্যালয়গুলো দ্রুত পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ এবং নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে নতুন ভবন নির্মাণের আগ পর্যন্ত নিরাপদ অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
নতুন ভবনের জন্য আবেদন
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল কুদ্দুস তালুকদার জানান, সম্প্রতি দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি বেশ কয়েকটি বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন। এর মধ্যে ১৯টি বিদ্যালয়কে অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন দ্রুত অপসারণ করে নতুন ভবন নির্মাণ প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, ভবন সংকটের কারণে কয়েকটি বিদ্যালয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় গোলপাতার ঘরে পাঠদান চলছে। ১৯টি বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের চাহিদা জানিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা করছেন তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামান্না ফেরদৌসী জানান, বিষয়টি তার বিভাগের আওতাধীন নয়। এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান চললেও এখনো নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হওয়ায় শিক্ষক-অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দুর্ঘটনার অপেক্ষা না করে দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো অপসারণ করে নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত করা হোক।
