রেহানা ফেরদৌসী
শীতে কাঁপছে দেশ। চলতি শীত মৌসুমে সারা দেশে যে অতিরিক্ত শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, তা স্বাভাবিক শীতের সময়সীমা বহু আগেই অতিক্রম করেছে। ভোরের কুয়াশা, হিমেল বাতাস এবং সূর্যহীন দিনগুলো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরমভাবে ব্যাহত করছে। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা এক অঙ্কের ঘরে নেমে আসায় শীত আর শুধু একটি ঋতু নয়, এটি রূপ নিয়েছে নীরব প্রাকৃতিক দুর্যোগে। খোলা আকাশের নিচে থাকা মানুষ, দিনমজুর, রিকশাচালক ও শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। কাজ কমে যাওয়ায় অনেকেই আয়ের উৎস হারাচ্ছেন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শীতজনিত মৃত্যুর খবর উদ্বেগজনক।
গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও জটিল। সেখানে শীতবস্ত্রের প্রাপ্যতা সীমিত, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ কম এবং সচেতনতার অভাব স্পষ্ট। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়হীনতা ও বিলম্বিত পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
অতিরিক্ত শীতের প্রভাব কৃষি খাতেও পড়েছে। শীতকালীন ফসল, বিশেষ করে সবজি ও বোরো চারা ক্ষতির মুখে পড়ছে। কুয়াশার কারণে রোগবালাই বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে। এর প্রভাব ভবিষ্যতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ওপরও পড়তে পারে।
মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, এবং মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সমাজে মানুষেরই একটি বড় অংশ অসহায়, দুস্থ। তারা আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার নূন্যতম মৌলিক অধিকারগুলো তাদেরও ন্যায্য প্রাপ্য। তারা আমাদের মতো দামি গরম পোশাক তো দূরে থাক, সামান্য কাপড়টুকুই নেই। তাই দেশের মানুষের পাশাপাশি প্রবাসীদের প্রতি আহবান- আসুন, আমরা যে যা পারি তাই দিয়েই শীতার্তদের পাশে দাঁড়াই।
শীতের একটি বড় ইবাদত হলো অসহায় মানুষকে সহযোগিতা করা। হাড় কাঁপানো শীতের কবল থেকে তাদের রক্ষা করা এবং সামর্থ্যরে ভিত্তিতে সাহায্য সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা প্রত্যেক মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব। সামনের দিনগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই শীতের তীব্রতা আরো বাড়বে। শিশু ও বৃদ্ধরা নানা ধরনের রোগব্যাধি আসছেন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে। এমতাবস্থায় একজন মানুষ হয়ে আর একজন অসহায় কর্মঅক্ষম মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘তাদের (বিত্তশালী) ধন সম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে’ (সুরা জারিয়াত : ১৯)। একই বিষয়ে আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি তথা তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে দরিদ্র, এতিম ও বন্দীদের খাদ্য দান করে’ (সুরা দাহর-৮)। হযরত আবু সাঈদ (রা) বলেন, মহানবী(সা:) বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান অপর মুসলমানকে বস্ত্রহীনতায় ঢাকার জন্য কাপড় দিলে আল্লাহ পাক তাকে জান্নাতে এর সবুজ কাপড় পরাবেন’ (তিরমিজি)। রাসূলাল্লাহ্ (সা:) আরও বলেছেন, “তোমরা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দাও, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজখবর নাও, বস্ত্রহীন লোকদের বস্ত্র দাও এবং বন্দিকে মুক্ত করে দাও’ (বুখারি)।
এ পরিস্থিতিতে সরকারের একক দায়িত্ব ভেবে থেমে থাকা চলবে না। কোনো দেশ বা রাষ্ট্রের পক্ষে এককভাবে শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো অসম্ভব এবং বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য তা সত্যিই অবাস্তব। শীতপ্রবণ অঞ্চল চিহ্নিত করে পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র বিতরণ, ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা জোরদার এবং আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, বিত্তবান, প্রবাসীদের মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে এগিয়ে আসতে হবে। শীত প্রকৃতির নিয়ম, কিন্তু অতিরিক্ত শীতের কষ্ট যেন মানুষের অবহেলার কারণে দুর্ভোগে পরিণত না হয়Ñসেদিকে দৃষ্টি দেওয়াই এখন সময়ের দাবি। মানবিকতা, দ্রুত পদক্ষেপ ও সমন্বিত উদ্যোগই পারে এ শীতে অসহায় মানুষের জন্য কিছুটা উষ্ণতা ফিরিয়ে আনতে।
আমি, আপনি কি করতে পারি?
আমরা..যাদের সৃষ্টিকর্তা ভালো রেখেছেন , এ ভালো থাকাটা আমাদের জন্য মহান আল্লাহর এক মহান নেয়ামত ও রহমত। তাই ভালো থাকা মানুষগুলো অর্থাৎ আমাদের উচিত, ভালো থাকার নেয়ামত ও রহমতের শুকরিয়া স্বরূপ অসহায় মানুষ ও শীতার্ত মানুষদের অভাব ও দুঃখরোধে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া। শুধু ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকেই নয়, এটি মানুষ হিসেবে নৈতিক দায়িত্ব, পারিবারিক সুশিক্ষার বহিঃপ্রকাশ, সুশিক্ষিত-সৃজনশীল মনোভাব। তথ্য-প্রযুক্তির(অনলাইন মানি ট্রান্সফার) এ সময়ে অসহায় মানুষের সহযোগিতা কোনো কঠিন বিষয় নয়। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছার। অনেক আন্তর্জাতিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান এভাবেও তাদের মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন। শীত কে কোন কিছু করার ক্ষমতা মানুষের নেই কিন্তু সকল মানুষ একসাথে শীতার্ত মানুষদের জীবন বদলে দিতে পারে! আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহ সহ সকলকে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর তাওফিক দান করুন।
