মিজানুর রহমান, শ্যামনগর
ময়নাতদন্ত শেষে পুলিশ প্রহরায় দাফন সম্পন্ন হয়েছে সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের বনবিভাগের সদস্যদের গুলিতে নিহত আমিনুর রহমান গাজীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যার আগে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের ৯নং সোরা গ্রামে দাফন করা হয়। এর আগে পুলিশ প্রহরায় এলাকায় পৌঁছায় তার মরদেহ। এ ঘটনায় সাতক্ষীরা ও শ্যামনগর জুড়ে চরম উত্তেজনা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

দাফনকালে কালিগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাজীব, শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খালেদুর রহমান ও গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলমসহ স্থানীয়রা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
নিহত আমিনুর রহমান গাজীর পরিবার জানান, তারা বুধবার খুলনা জেলার কয়রা থানায় আমিনুর রহমান গাজীকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এদিকে মঙ্গলবার নিহত জেলের বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন সরকারের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

এদিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে শ্যামনগর উপজেলা বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা গ্রামে নিহত জেলের বাড়িতে যান।

এ সময় ড. মনিরুজ্জামানের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে নিহত পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং সান্ত্বনা দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনে জেলে নিহতের এই ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। সরকারের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একটি সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে এবং প্রকৃত দোষীদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

নিহত আমিনুর রহমান গাজী ৫টি সন্তান রেখে গেছেন। মঙ্গলবার নিহতের বাড়িতে গিয়ে ড. মনিরুজ্জামান বিএনপির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করেন এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন।

সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. মনিরুজ্জামান বলেন, একটি সাধারণ পাস (অনুমতিপত্র) নিয়ে বনে যাওয়া অসহায় জেলের বুকে এভাবে গুলি চালানো কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমরা বিএনপির পক্ষ থেকে এই শোকাবহ পরিবারের পাশে আছি।

অপরদিকে, দুপুর ১২টার দিকে নিহতের পরিবারকে সান্ত্বনা ও সহায়তা দিতে আসে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রতিনিধি দল। শ্যামনগর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আব্দুর রহমান নিহতের পরিবারের হাতে আর্থিক সহযোগিতা তুলে দেন।

মাওলানা আব্দুর রহমান বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে এই পরিবারটি আজ দিশেহারা। জামায়াতে ইসলামী সবসময় মজলুমের পাশে থাকে। আমরা এই অসহায় পরিবারটিকে আর্থিক সহযোগিতা করেছি এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এই ৫ এতিম সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে সবসময় পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গত ১৩ মে সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন থেকে পাস নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করেছিলেন আমিনুরসহ ৪ জেলে। সোমবার সকাল ৭টার দিকে খুলনা রেঞ্জের নলিয়ান স্টেশনের পাটকোস্টা হেলাবাসী অভয়ারণ্য এলাকায় কাঁকড়া আহরণের সময় বন বিভাগের ‘স্মার্ট পেট্রোলিং টিম’-এর সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে আমিনুর রহমান গাজী ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

এ ঘটনার পর সোমবার (১৮ মে) বিকেলে নিহত জেলে আমিনুর রহমানের মরদেহ নিয়ে শত শত বিক্ষুব্ধ বনজীবী ও স্থানীয় বাসিন্দা লাঠিসোঁটা হাতে শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী এলাকায় বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিস ও পাশের স্টেশন অফিসে চড়াও হয়।

বিক্ষুব্ধ জনতা অফিস ভবনসহ ভেতরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। হামলায় বনকর্মী তপন, মেজবাহ, ফারুক, এখলাছুর ও ফায়জুর মারাত্মক জখম হন। খবর পেয়ে বিজিবি ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আহতদের উদ্ধার করে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

বন বিভাগ সূত্র জানায় সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের খুলনা রেঞ্জের নলিয়ান স্টেশনের আওতাধীন পাটকোস্টা টহল ফাঁড়ির নিষিদ্ধ অভয়ারণ্য এলাকায় খুলনা রেঞ্জের স্মার্ট টহল দল দুইটি নৌকা দেখতে পেয়ে কাছাকাছি গেলে জেলেরা ডাঙায় উঠে যায়।

এ সময় জেলেদের নৌকা আনার চেষ্টা করলে জেলেরা বৈঠা-দা-কুড়াল নিয়ে স্মার্ট টহল টিমের সদস্যদের বেধড়ক মারধর করে টহল দলের সদস্যদের কাছ থেকে চাইনিজ রাইফেল ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে দা এবং বৈঠা দিয়ে চাইনিজ রাইফেলের মাঝখানে আঘাত করলে রাইফলেটি ভেঙে গিয়ে গুলি বের হয়ে একজন জেলে গুলিবিদ্ধ হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়ায় বাড়ি নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খালেদুর রহমান জানান, সুন্দরবনে গুলিতে জেলে নিহত এবং পরবর্তীতে বন বিভাগের অফিসে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে এই পৃথক দুটি ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কোনো পক্ষই থানায় লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের করেনি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ও সিদ্ধান্তের আলোকে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Share.
Exit mobile version