বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে যশোরের তিন ঐতিহাসিক রেলস্টেশন, ঝিকরগাছার গদখালী, সদর উপজেলার মেহেরুল্লাহনগর ও ধোপাখোলা।
একসময় যাত্রী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের পদচারণায় মুখর থাকা এসব স্টেশন এখন অনেকটাই নীরব। কোথাও স্টেশন ভবন জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে আছে, কোথাও প্ল্যাটফর্ম-রেলপথ আগাছা ও লতাপাতায় ঢেকে গেছে। দিনের বেলায় কোনো কোনো স্থানে গরু-ছাগল চরছে।
রেল যোগাযোগের ঐতিহ্য বহন করা এসব স্টেশন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় স্থানীয় মানুষের ভোগান্তি বাড়ার পাশাপাশি হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর স্মৃতিও।
বিশেষ করে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) কাছে হওয়ায় মেহেরুল্লাহনগর স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি চালু হলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ আশপাশের মানুষের যাতায়াতে অনেক সুবিধা হবে।
অন্যদিকে ফুলের রাজধানী হিসেবে পরিচিত গদখালী স্টেশন চালু হলে ফুলচাষিরা ট্রেনে দ্রুত দেশের বিভিন্ন স্থানে ফুল পাঠানোর সুযোগ পাবেন। আর ধোপাখোলা স্টেশন পুনরায় চালু হলে কৃষক ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনে সুবিধা হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
গদখালীতে স্টেশন
ঐতিহাসিকভাবে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ছিল অন্যতম প্রাচীন ও সমৃদ্ধ জনপদ। উনিশ শতকের গোড়ায় ম্যালেরিয়া ও পরবর্তী মহামারিতে অঞ্চলটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও রেল যোগাযোগ চালুর পর গদখালী আবার গুরুত্বপূর্ণ জনপদে পরিণত হয়। ১৮৮২ থেকে ১৮৮৪ সালের মধ্যে বেঙ্গল সেন্ট্রাল রেলওয়ে দমদম জংশন থেকে খুলনা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ করে। এরই অংশ ছিল বেনাপোল-যশোর রেলপথ।
একসময় শিয়ালদহ থেকে বনগাঁ, পেট্রাপোল, গদখালী হয়ে খুলনা যাওয়া ‘বরিশাল এক্সপ্রেস’ ট্রেনও এ পথে চলাচল করত। রেল যোগাযোগের কারণে গদখালী দুই বাংলার যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। দেশভাগের পরও পাসপোর্ট-ভিসা ব্যবহারের মাধ্যমে এ রুটে দুই বাংলার মানুষের যোগাযোগ অব্যাহত ছিল।
তবে ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর ‘বরিশাল এক্সপ্রেস’সহ এ পথে দীর্ঘদিনের আন্তঃদেশীয় ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে গদখালী সারাদেশে পরিচিত ফুল উৎপাদনের জন্য। ১৯৮২ সালে ফুলচাষি শের আলীর হাত ধরে গদখালী নতুন পরিচিতি পায় ‘ফুলের রাজ্য’ হিসেবে।
এখন গদখালী ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বছরজুড়ে নানা জাতের ফুল উৎপাদিত হয়। কিন্তু ফুলের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বাড়লেও ঐতিহাসিক গদখালী রেলস্টেশন হারিয়েছে তার পুরোনো কর্মচাঞ্চল্য। পরিত্যক্ত স্টেশন ভবনের দেয়ালে এখনো পুরোনো ‘টিকিট লইবেন’ লেখা রয়েছে।
টিকিট কাউন্টার খোলার সময়সূচির পুরোনো লেখাও মুছে যায়নি। স্টেশন ভবনের ছাউনিতে অবস্থিত মলিন ‘গদখালী’ নামটি যেন রেল যোগাযোগের দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গদখালী ফুল উৎপাদক ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, গদখালীর ফুলচাষিরা দীর্ঘদিন ধরে স্টেশনটি চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন।
স্টেশন চালু হলে ট্রেনে করে পদ্মা সেতু হয়ে দ্রুত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ফুল পাঠানো সম্ভব হবে। এতে ফুল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি ও পরিবহন ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে সারা বছর গদখালীতে আসা দর্শনার্থীদেরও যাতায়াত সহজ হবে।
মেহেরুল্লাহনগর রেলস্টেশন
সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামে অবস্থিত মেহেরুল্লাহনগর রেলস্টেশন। সমাজসেবী মেহেরুল্লাহর নামে নামকরণ করা স্টেশনটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বর্তমানে একটি মেইল ট্রেন থামে। তবে কোনো আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি নেই। স্টেশনটি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একেবারে কাছে।
ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আশপাশের বাসিন্দাদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। এ স্টেশনে আন্তঃনগরসহ সব ধরনের ট্রেনের যাত্রাবিরতি চালুর দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ বিষয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠিও পাঠানো হয়েছে। গত ১২ আগস্ট যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীরের নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কাজী জালাল উদ্দীন স্বাক্ষরিত চিঠিটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়।
চিঠির অনুলিপি প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব, শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত সচিব, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিবের কাছেও পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে যবিপ্রবিতে ৩৮টি বিভাগ, আটটি অনুষদ, দুটি ইনস্টিটিউট, ছয়টি আবাসিক হল ও ২৪টি দপ্তর রয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়মিত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করতে হয়।
যবিপ্রবির শিক্ষার্থী ওমর ফারুক বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষার্থীরা যবিপ্রবিতে পড়তে আসেন। ছুটিতে বাড়ি যাওয়া কিংবা জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যাওয়ার সময় ট্রেন আমাদের জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ পরিবহন হতে পারে। কিন্তু কাছের স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেন না থামায় আমাদের যশোর শহরে যেতে হয়। মেহেরুল্লাহনগর স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেন থামলে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা ও স্থানীয় মানুষও উপকৃত হবেন।
ধোপাখোলা স্টেশন
যশোর-বেনাপোল রেলপথের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন সদর উপজেলার ধোপাখোলা। ১৮৮৪ সালে স্থাপিত এ স্টেশন একসময় আশপাশের কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।
দূরদূরান্ত থেকে মানুষ গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি কিংবা হেঁটে এসে এ স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠতেন। কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শহরের সঙ্গে যোগাযোগে স্টেশনটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়া এবং মানুষের যাতায়াতের ধরন বদলে যাওয়ায় ধোপাখোলা স্টেশনের গুরুত্ব কমতে থাকে। একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় কার্যক্রম। বর্তমানে স্টেশন ভবন ও প্ল্যাটফর্ম আগাছা-লতাপাতায় ঢেকে গেছে। জরাজীর্ণ ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব প্রকৌশলী রুহুল আমিন বলেন, রেলপথ হলো সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ মাধ্যম। এ বন্ধ স্টেশনগুলো আবারও চালু হলে স্থানীয় কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
যবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর জানান, মেহেরুল্লাহনগর স্টপেজ চালু হলে হাজারও শিক্ষার্থীর সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
যশোর রেলওয়ে জংশনের স্টেশন মাস্টার সাইদুজ্জামান জানান, স্টেশন সচল করা কিংবা আন্তঃনগর ট্রেনের নতুন স্টপেজ দেয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। তবে স্থানীয় জনগণের এ যৌক্তিক দাবির বিষয়টি এবং স্টেশনগুলোর বর্তমান জরাজীর্ণ অবস্থার চিত্র তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
