# ৪২টি ঘটনায় ৩১ মামলা, ৯টি ধর্ষণ
# পুরনো ও স্পর্শকাতর মামলাগুলো দ্রুত
নিষ্পত্তি করতে আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি : পিপি
বাংলার ভোর প্রতিবেদক
গত ১৫ মার্চ ফুলের রাজধানী খ্যাত যশোরের ঝিকরগাছার গদখালী বাজারে ২৫ বছর বয়সী এক তরুণী ফুল কিনতে যান। এ সময় আমিনুর নামে এক যুবক মিথ্যা তথ্য দিয়ে ওই তরুণীকে পার্শ্ববর্তী নাটুয়াপাড়া গ্রামের এক লিচুবাগানে নিয়ে যান। সেখানে আমিনুলের সঙ্গে যোগ দেন জাবেদ, ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন বাপ্পী ও দপ্তর সম্পাদক ইয়াসিন আরাফাত। পরে চারজনে মিলে তাকে ধর্ষণ করেন। ঘটনাস্থল থেকে ভুক্তভোগী তরুণী ৯৯৯ ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে। এই ঘটনায় থানায় মামলা হলে ঘটনার দিন রাতেই চারজনকে আটক করে পুলিশ। বর্তমানে ওই চার আসামি কারাগারে থাকলেও ধর্ষিতা তরুণী মানসিক বিপর্যস্ততা ও সামাজিক বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন।
গত ১৯ মার্চ যশোর শহরের খড়কি এলাকার রিকশাচালকের ৫ বছরের শিশু কন্যাকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠে প্রতিবেশি এক কিশোরের বিরুদ্ধে। খবর পেয়ে প্রতিবেশি বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিচারের দাবিতে থানা ঘেরাও করে। ভুক্তভোগী শিশুর বাবা মামলা করলে অভিযুক্ত আরমানকে আটক করে পুলিশ। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ প্রতিবেশি শিক্ষার্থীরা বিচারের দাবিতে অভিযুক্ত আরমানকে মারপিট করে থানা হেফাজত থেকে কয়েক দফা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালায়। বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে থানার এক কনস্টেবলকেও হামলা করে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।
শুধু এই দুটি ঘটনা নয়; যশোরে ধর্ষণ ও নারী শিশুর উপর নিপীড়নের ঘটনা বেড়েছে। নির্যাতনের সব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলনা রক্ষাকারী বাহিনীর কান পর্যন্ত পৌঁছে না। এরপরও চলতি মার্চসহ গত তিন মাসে যশোরে ৪২টি নারী ও শিশু নিপীড়ন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৩১টি ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলা হওয়া সংখ্যার ভিতরে ৯টি ধর্ষণ বাকী ২২টি নারী নিপীড়নের। সংশ্লিষ্টরা বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণসহ অপতৎপরতা বেড়েছে। মানুষের সুস্থ সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। পারিবারিক এবং সামাজিক শাসন ব্যবস্থা না থাকায় বারবার এই ঘটনা ঘটছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, গত ১৬ মার্চ রাতে যশোরে চার বছর বয়সী শিশুর গলায় ছুরি ধরে তার মাকে (২৬) ধর্ষণের চেষ্টা করে এক দুর্বৃত্ত। পরে ওই নারীর চিৎকারে এলাকাবাসী ছুটে এলে তাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। আহত নারীকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় হাসান নামে একজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ১৭ মার্চ রাতে মণিরামপুর হাজরাকাটি গ্রামে ১২ বছর বয়সী পুতনিকে ধর্ষণের অভিযোগে দাদা লুৎফর রহমান গাজী (৬০) আটক করে থানা পুলিশ। ধর্ষণের অভিযোগে মামলা ও ধর্ষককে আটক করে পুলিশ। যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটিতে ভিক্ষুকের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া ১১ বছর বয়সী কন্যাকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে ১৯ মার্চ থানায় মামলা করে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি যশোরের ঝিকরগাছার বোধখানা গ্রামে এক নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। ৩ জানুয়ারি একই উপজেলার চাপাতলা গ্রামের এক কিশোরীকে অপহরণ করে দুর্বৃত্তরা। ১২ মার্চ রাতে বকুলিয়া গ্রামে এক গৃহবধূকে ধর্ষণের চেষ্টা করে এক প্রতিবেশি। গত ১৬ মার্চ যশোরে এক শিশু ধর্ষণের ঘটনায় শিশুটির মা বাদী হয়ে চার জনের নামে মামলা করেন। ধর্ষণের অভিযোগে শিশুটির ভগ্নিপতি সজীব (১৮), সজীবের ভাই রাতুল (১৭), তাদের বাবা হিটু মিয়া (৪২) ও মা জাবেদা বেগমকে (৪০) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত পহেলা ফেব্রুয়ারি চৌগাছার বহিলাপোতা গ্রামে এক গৃহবধূকে ধর্ষণ করা হয়।
ধর্ষণের শিকার হওয়া এক গৃহবধূ সম্প্রতি বলেন, ‘ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর সামাজিকভাবে সব জায়গায় হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছি। আগের মতো সামাজিকভাবে সবার সঙ্গে মেলামেশা করতে পারছি না। ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর স্থানীয় প্রভাবশালীরা বিষয়টি মিলমিশ করার চাপ দেয়। পরে সাহস করে মামলা করলেও আসামিরা আটক হয়নি।’
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নুর ই আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘পারিবারিক ও সামাজিকভাবে এই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের ব্যবস্থা না হলে এগুলো বন্ধ করা কঠিন। তারপরও যখন যেখানে অপরাধের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে পুলিশ সেখানেই ব্যবস্থা নিচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু ঘটনায় অপরাধীদের আটকের পর আদালতে সোপর্দ করেছে পুলিশ। সবগুলো ঘটনা বিচারাধীন।’
যশোরের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, ‘ধর্ষণ ও নারী নিপীড়নের ঘটনার অভিযোগ করলেও তদন্তে অনেকগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হচ্ছে। অনেকেই পূর্ব বিরোধ, প্রতিহিংসা পরায়ন হয়েও এই ধরনের মামলা করছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক দলাদলি, বিভাজন থেকেও কেউ কেউ মামলা করে থাকেন। দু পক্ষই যাতে সঠিক বিচার পান সেই কারণে তদন্ত বিলম্বের কারণে বিচার কাজ দেরি হয়। তারপরেও পুরনো ও স্পর্শকাতর মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি।’