শাহারুল ইসলাম ফারদিন
যশোর একসময় দেশের বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সংস্কৃতির অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্র আজ নানা সংকটে জর্জরিত। উন্নয়নের কথায় ভরপুর বক্তৃতা মিললেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় ব্যর্থতা, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং জবাবদিহির অভাব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মানুষের জীবন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যশোরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে আজ চোখে পড়ে ধসের ছবি কখনো প্রকল্পের ব্যর্থতা, কখনো রাজনৈতিক অস্থিরতা, আবার কখনো প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তা।
বেনাপোল স্থলবন্দর : দেশের বাণিজ্যের প্রধান গেটওয়েতেই সবচেয়ে বেশি বিশৃঙ্খলা
বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ স্থলবন্দর বাণিজ্য যশোরের বেনাপোল-পেট্রাপোল দিয়ে সম্পন্ন হয়। প্রতিদিন গড়ে ৩৫০–৪০০ ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে ভারতীয় অংশে ধীরগতি, কাগজপত্র জট, দালালদের নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রমিক সংগঠনের দ্বন্দ্বে বাণিজ্য কার্যক্রম বারবার স্থবির হয়ে পড়ছে। একদিনে দুই ঘণ্টা কাজ বন্ধ থাকলে প্রায় ২০ কোটি টাকার পণ্য আটকে থাকে, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যবসা–বাণিজ্য কিন্তু সমাধানে কোনও জরুরি উদ্যোগ নেই।
রাস্তা–ঘাট : কোটি টাকার প্রকল্প, তবুও যশোরের যোগাযোগ ব্যবস্থা মৃত্যু–ফাঁদ
যশোর শহর থেকে নওয়াপাড়া, ঝিকরগাছা থেকে শার্শা, বেনাপোল থেকে যশোর প্রায় সব প্রধান সড়কেই এখন বড় বড় গর্ত। ২০২২–২৩ অর্থবছরে সড়ক সংস্কারে বরাদ্দ ছিল ১০৬ কোটি টাকা, কিন্তু কাজের মান এত নিম্নমানের যে ছয় মাসের মধ্যেই সড়কগুলোর অবস্থা আবার আগের মতো ভয়ংকর। ট্রাক–বাস উল্টে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে, স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। জবাবদিহিতা? কেউ নেই।
রাজনৈতিক অস্থিরতা : শার্শা–যশোরে মনোনয়ন নিয়ে অন্তর্কোন্দলে বিষাক্ত পরিবেশ
মানুষের সেবা নয়, নীতি নয় আজ রাজনীতির কেন্দ্রে আছে ক্ষমতার দৌড়। শার্শা-১ আসনে মনোনয়ন নিয়ে এমন অস্থিরতা চলেছে যে দলীয় নেতাকর্মীরাই বিভক্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করছে রাজনীতি এখন এলাকায় শান্তি আনার বদলে অশান্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনলাইন জুয়া : কিশোর–যুবকদের নিঃস্ব করে দিচ্ছে “ডিজিটাল নেশা”
গত দুই বছরে যশোরে অনলাইন জুয়ার প্রভাবে অন্তত ১৭টি পরিবার ভেঙে গেছে এমন রিপোর্ট জানিয়েছে স্থানীয় কয়েকটি সংগঠন। মোবাইল দিয়ে বেটিং, বিকাশ–নগদে লেনদেন সব মিলিয়ে এটি এখন অপরাধ, আত্মহত্যা ও আর্থিক ধ্বংসের নতুন পথ। প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালায়, কিন্তু মূল চক্র রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
মাদক বিস্তার : সীমান্ত জেলার পুরোনো সংকট আরও ভয়ংকর
ফের সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিল, ইয়াবা, আইসসহ নতুন ধরনের মাদক প্রবেশ বাড়ছে। গত তিন মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ৩৫ হাজার বোতল ফেনসিডিল আটক করলেও, বড় মাদককারবারিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাদক–চুরি–ছিনতাই মিলিয়ে সন্ধ্যার পর যশোর শহর অনেকের কাছে আতঙ্কের নগর।
স্বাস্থ্য–শিক্ষা খাত : সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ
যশোর জেনারেল হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১২শ থেকে ১৩শ রোগী চিকিৎসা নিতে আসে, কিন্তু বেড আছে মাত্র ২৫০টি। ডাক্তার সংকট, নার্স সংকট, যন্ত্রপাতি অকেজো ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে খুলনা বা ঢাকায় ছুটছে। শিক্ষা খাতে শিক্ষক–সংকট, ভবন–সংকট দীর্ঘদিন ধরেই চলছে, কিন্তু সমাধান নেই।
অবশেষে যাদের হার সেই মানুষই চুপ করে, পরাজিত হয়ে বাঁচছে
যশোরের মানুষ কর দেয়, ভোট দেয়, আইন মানে কিন্তু বিনিময়ে পাচ্ছে অব্যবস্থাপনার চরম যন্ত্রণা।
প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি নেই, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নেই, রাজনৈতিক শান্তি নেই, সীমান্তে নিরাপত্তা নেই, অবশেষে হারছে মানুষই। যশোরের বাস্তবতা তাই আজ একটাই, যেখানে ভাঙন সর্বত্র, জবাবদিহিতা নেই কোথাও।
লেখক : সাংবাদিক

