জাহিদুল কবীর মিল্টন
ধর্মীয় শিক্ষাকে হাতিয়ার বানিয়ে যশোর শহরতলীর নুতন উপশহরে সরকারি কোনো অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে প্রকাশ্যে চালানো হচ্ছে একটি অবৈধ মাদ্রাসা। বি ব্লক বাজার সংলগ্ন মসজিদের জায়গায় গড়ে ওঠা ‘ইসলামী আদর্শ বহুমুখী মাদ্রাসা’ নামের এই প্রতিষ্ঠানটির আড়ালে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে পরিচালক ইকবাল হোসেন ইকুর বিরুদ্ধে। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালার কোন তোয়াক্কা না করে ব্যবসা চালিয়ে গেলেও রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে স্থানীয় প্রশাসন। ফলে এই অবৈধ প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পূর্বে ‘ইসলামী আদর্শ বহুমুখী কওমি মাদ্রাসা’ নামে পরিচালিত হলেও ২০১৯-২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময় কওমি মাদ্রাসা নিবন্ধনে সরকারি কড়াকড়ি শুরু হয়। নীতিমালার শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়ে পরিচালক ইকবাল হোসেন ইকু রাতারাতি ‘কওমি’ শব্দটি বাদ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নতুন নাম দেন ‘ইসলামী আদর্শ বহুমুখী মাদ্রাসা’। বর্তমানে মসজিদের নির্মিত দ্বিতল ভবন ভাড়া নিয়ে ১ম থেকে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থীকে আরবির পাশাপাশি জেনারেল শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি কওমি, আলিম, কামিল নাকি ফাজিল-তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি পরিচালক নিজেই।
প্রতি মাসে আয় ৩ লাখ টাকা
উচ্চহারে ফি আদায় একটি সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের চেয়েও বেশি হারে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে ৬০০ টাকা করে বেতন নেয়া হচ্ছে। ৫০০ শিক্ষার্থীর হিসাব অনুযায়ী, কোনো স্বীকৃতি ছাড়াই কেবল বেতন বাবদ প্রতি মাসে ৩ লাখ টাকা আয় করছেন ইকু। এছাড়া নিজস্ব সাইনবোর্ডে বাংলা, ইংরেজি, আরবি ও কম্পিউটারের সুব্যবস্থার কথা প্রচার করা হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাধ্যতামূলক কোনো শর্তই এখানে পালন করা হয় না।
যা বলছে সরকারি নীতিমালা কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী
জমি ও অবকাঠামো: পৌর এলাকায় অন্তত ০.২০ একর রেজিস্ট্রিকৃত জমি, ২০০০ বর্গফুটের শ্রেণীকক্ষ এবং স্থায়ী খেলার মাঠ থাকতে হবে। আর অনুমোদন প্রক্রিয়া প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফি জমা দিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদনের পর সরেজমিন তদন্ত সাপেক্ষে পাঠদানের অনুমতি মিলবে। এছাড়া প্রধান শিক্ষকের যোগ্যতা ফাজিল বা সমমান এবং উপজেলা শিক্ষা কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত দুই বছর মেয়াদী ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকা বাধ্যতামূলক।
বাস্তবে এই প্রতিষ্ঠানের জমি, খেলার মাঠ, মানসম্পন্ন শৌচাগার বা স্বীকৃত পরিচালনা কমিটির কোনো অস্তিত্বই নেই। সম্পূর্ণ একক নিয়ন্ত্রণে নিজের নিয়মকানুন দিয়ে মাদ্রাসাটি পরিচালনা করছেন ইকু।
অভাবী জীবন থেকে রহস্যজনক কোটিপতি
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপশহরের বি-১১৫ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা ইকবাল হোসেন ইকু একসময় মুদি দোকান, টিনের ব্যবসা, সাইকেল স্ট্যান্ড, ক্যারাম বোর্ড ও ভাঙ্গাড়ির ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পরবর্তীতে ঢাকায় গিয়ে এক পীরের মুরিদ হন এবং একটি বিতর্কিত ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েন। এরপর এলাকায় ফিরে মাদ্রাসা ব্যবসাকে মূল হাতিয়ার বানিয়ে বর্তমানে পাথরের ব্যবসাসহ কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান। সাভারে কয়েক বিঘা জমিসহ বিভিন্ন ব্যাংকে তার বিপুল অঙ্কের আমানত রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এমনকি নিজ বাড়িতে অবৈধভাবে গড়ে তোলা একটি মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষিকাকে অনৈতিক সম্পর্কের পর বিয়ে ও পরবর্তীতে ডিভোর্স দেয়ার ঘটনাও ঘটিয়েছেন তিনি।
অনুমোদন ছাড়া দীর্ঘ ২৫ বছর কীভাবে পরিচালনা করছেন জানতে চাইলে ইকবাল হোসেন ইকু ঔদ্ধত্য দেখিয়ে বলেন, “যা পারেন লেখেন, আমাকে কেউ কিছু করতে পারবে না। যেখানে যত টাকা লাগবে দেবো।”
এ বিষয়ে যশোর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মাহফুজুল হোসেন জানান, ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত মাদ্রাসা পরিচালনা করতে হলেও অবশ্যই সরকারের অনুমতি নিতে হবে। অনুমোদন ছাড়া পরিচালনা করা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আইনগত ব্যবস্থা নেবেন।
এদিকে, ধর্মীয় শিক্ষাকে বাণিজ্যের মাধ্যম বানিয়ে কোমলমতি শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসনসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন এলাকাবাসী।

