বাংলার ভোর প্রতিবেদক
দেশের মাছের রেণু পোনার মোট চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশই সরবরাহ হয় যশোর থেকে। শহরতলী চাঁচড়া ও আশপাশ এলাকায় গড়ে ওঠা শতাধিক হ্যাচারি থেকে প্রতিবছর উৎপাদিত হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু ও পোনা। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব রেণু-পোনা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
এই বাণিজ্যকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড; জীবিকা নির্বাহ করছেন কয়েক লাখ মানুষ। শুধু চাঁচড়ার মাছের পোনা মোকামেই প্রতিদিন গড়ে ৪ শ’ থেকে ৫শ’ মণ পোনা বিকিকিনি হয়, যার আর্থিক মূল্য বছরে প্রায় শত কোটি টাকা।
যশোর শহরতলীর চাঁচড়া এলাকার এই মোকামে বর্তমানে ৫ শ’ থেকে ৬ শ’ ব্যবসায়ী রয়েছেন। রুই, মৃগেল, কাতলা, শিং, টেংরা, পাবদা, খলসে, সিলভার কার্পসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু ও পোনা পাওয়া যায় এখানে।
প্রতিদিন ট্রাক, পিকআপ, বাসের ছাদ এমনকি ট্রেনে করে এসব পোনা পাঠানো হয় ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, বরিশাল, ভোলা, ফরিদপুর, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। এ মোকামকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করেন প্রায় দুই হাজার মানুষ। ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে মোকামে রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, মৃগেল ২২০ থেকে ২৮০ টাকা, কাতলা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং সিলভার কার্প ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা দরে।
এ ছাড়া শিং মাছ প্রতি হাজার ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, টেংরা ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং পাবদা ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বৃষ্টিপাত বাড়ায় মোকামে ক্রেতা-বিক্রেতাদের আনাগোনাও বেড়েছে।
মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, গত অর্থবছরে যশোরের হ্যাচারিগুলোতে রুই, কাতলা, মৃগেল, কই, শিং, টেংরা, তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির ৪৭ হাজার ১৫৭ কেজি রেণু উৎপাদন হয়েছে। জেলার নিজস্ব চাহিদা ছিল ১৯ হাজার ৩১৭ কেজি। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়েছে ২৭ হাজার ৭৩৪ কেজি রেণু পোনা। যশোরের মৎস্যপল্লী হিসেবে পরিচিত চাঁচড়া এলাকায় গড়ে উঠেছে ৩৮টি হ্যাচারি।
তবে হ্যাচারি মালিকদের হিসাবে, চাঁচড়া ও আশপাশের এলাকায় শতাধিক হ্যাচারি রয়েছে। এসব হ্যাচারিতে রুই, কাতলা, থাই পাঙাশ, শিং, কই, মাগুর, সিলভার কার্প, তেলাপিয়া, টেংরা, কালবাউশ, মিরর কার্প ও মৃগেলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু-পোনা উৎপাদন করা হয়।
যশোর জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি ফিরোজ খান বলেন, আশির দশকে যশোরে মাছের রেণু উৎপাদন শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে এ শিল্পের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। বর্তমানে জেলার হ্যাচারিগুলোতে প্রতিবছর কমপক্ষে ২০০ কোটি টাকার রেণু-পোনা বিক্রি হয়। এসব রেণু-পোনা দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পুকুর, ঘের, বাওড় ও জলাশয়ে মাছ চাষ হচ্ছে।
এর সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। তিনি বলেন, যশোরে উৎপাদিত সাদা মাছের রেণু-পোনা দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ পূরণ করছে। ফলে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধিতে যশোরের হ্যাচারি শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এদিকে গুণগতমানের রেণু উৎপাদন, বিদ্যুৎ ও পানি সাশ্রয় এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে বিশেষ অবদান রেখে মৎস্য চাষে স্বর্ণপদক পেয়েছেন যশোরের হ্যাচারি ব্যবসায়ী আমিরুল হক।
শহরতলীর চাঁচড়া ডালমিল এলাকায় অবস্থিত ন্যাশনাল ফিস হ্যাচারির স্বত্বাধিকারী আমিরুল গত অর্থবছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকা মূল্যের ১০ হাজার কেজি রেণু উৎপাদন করেন। জাতীয় মৎস্য পক্ষ উপলক্ষে এসব সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে রোববার প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে তিনি স্বর্ণপদক গ্রহণ করেন।
ন্যাশনাল ফিস হ্যাচারিতে সোলার প্যানেল ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খরচ প্রায় ৬০ শতাংশ কমানো হয়েছে। পাশাপাশি পানি রিসাইক্লিং করে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো এবং নিজস্ব প্রযুক্তির মাধ্যমে গুণগতমানের রেণু উৎপাদন করা হচ্ছে এখানে। যশোর জেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, বিদ্যুৎ ও পানি সাশ্রয়, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং গুণগতমানের রেণু উৎপাদনে ন্যাশনাল ফিস হ্যাচারি বিশেষ দক্ষতা আমিরুল হক স্বর্ণপদক পেয়েছে। জেলার চাহিদা মিটিয়ে যশোরে উৎপাদিত ৬০ শতাংশ মাছ দেশের বিভিন্ন জেলাতে এলাকায় চলে যায়।
যশোরের হ্যাচারি শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, মানসম্মত রেণু উৎপাদন এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারি সহযোগিতা বাড়ানো গেলে এ খাত আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। এতে একদিকে দেশের মাছের উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে যশোরের রেণু-পোনা শিল্পে সৃষ্টি হবে আরও কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। যশোর মৎস্য হ্যাচারি মালিক সমিতির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক শামসুদ্দীন চৌধুরী সুমন বলেন, যশোরের উৎপাদিত মাছের পোনা দেশের মৎস্য খাতের অন্যতম প্রধান যোগানদাতা।
এখানকার হ্যাচারিগুলোতে উন্নত প্রযুক্তি ও মানসম্মত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা উৎপাদন করা হয়। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পোনা দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। যশোরের পোনার মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের চাষিদের কাছে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে হ্যাচারি শিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে বিদ্যুৎ, উৎপাদন খরচ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করেন এ নেতা।
