জাহিদুল কবীর মিল্টন ও কাজী নূর
যশোর শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া রোডে অবস্থিত পপুলার মেডিকেল সার্ভিসেস অ্যান্ড হসপিটালের বিরুদ্ধে অনুমোদনহীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা, পরিবেশ ও ফায়ার লাইসেন্স না থাকা, চিকিৎসাবর্জ্য অব্যবস্থাপনা, নদীর জায়গা দখলসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চিকিৎসাসেবার আঁড়ালে প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়ম চলে এলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাসপাতালটির স্বাস্থ্য বিভাগের অনুমোদনের মেয়াদ প্রায় এক বছর আগে শেষ হয়েছে। ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এর পাশাপাশি হাসপাতালটির পরিবেশগত ছাড়পত্র (ইসিসি) ও পরিবেশগত লাইসেন্স না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফায়ার লাইসেন্স নিয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগগুলোর একটি হলো হাসপাতালের চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা। অভিযোগ রয়েছে, ব্যবহৃত চিকিৎসাসামগ্রি ও অন্যান্য বর্জ্য যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি না করে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে। বিশেষ করে পয়ঃনিষ্কাশনের পানি নিকটবর্তী ভৈরব নদে ফেলার অভিযোগ রয়েছে।
চিকিৎসাবর্জ্য সাধারণ বর্জ্যরে মতো নয়। ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ইনজেকশনের সুই, রক্তমাখা তুলা, জীবাণুযুক্ত সামগ্রিসহ বিভিন্ন বর্জ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তি না করলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নদী বা উন্মুক্ত স্থানে ফেললে মাটি, পানি ও পরিবেশ দূষিত হতে পারে।
চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য দেশে নির্দিষ্ট আইন ও বিধিমালা রয়েছে। ২০০৮ সালের চিকিৎসা-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বিধিমালা অনুযায়ী বর্জ্য পৃথকভাবে নির্ধারিত পাত্রে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার বিধান রয়েছে। পরিবেশগত ছাড়পত্র ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না।
এ বিষয়ে যশোর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতাউর রহমান বলেন, পরিবেশগত লাইসেন্স না থাকা বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান চালিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। ফলে এখন দেখার বিষয়, পপুলার হাসপাতালের বিরুদ্ধে সেই পদক্ষেপ বাস্তবে কত দ্রুত নেয়া হয়।
নদীর জায়গা দখলের অভিযোগ
হাসপাতালটির বিরুদ্ধে ভৈরব নদের জায়গা দখল করে পাওয়ার স্টেশন নির্মাণের অভিযোগও উঠেছে। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি বলেন, নদীর জায়গা দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং দ্রুত অভিযান চালানো হবে। একই সাথে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হাসপাতালটি আন্ডারগ্রাউন্ডে পরিচালনা করছে তাদের কার্যক্রম।
এদিকে হাসপাতালের সামনের অংশ পৌরসভার রাস্তার জায়গা দখল করে সম্প্রসারণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। যশোর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মোখলেসুর রহমান জানান, রাস্তা মাপার পর সরকারি জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের প্রমাণ পাওয়া গেলে তা ভেঙে দেয়া হবে।
অনুমোদনহীন কার্যক্রমের প্রশ্ন
হাসপাতালটির বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের পাশাপাশি অনুমোদন নবায়ন না করেই কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টিও গুরুতর। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে অনুমোদন, নির্ধারিত জনবল, চিকিৎসক-নার্স, প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান, প্যাথলজি সক্ষমতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
একটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যদি সেটি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে, তাহলে শুধু প্রতিষ্ঠানটির নয়-তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
ফায়ার লাইসেন্সের বিষয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে ০১৭১৮…৯৯৮/০১৯০১…৭২৮ নাম্বারে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, হাসপাতালের দোতলায় রোগী চিকিৎসার আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। এমনকি এসব কার্যক্রম বাঁধাহীন করতে জনৈক নাসিরের নেতৃত্বে কয়েকজন সন্ত্রাসীকে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। তাই অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে পপুলার মেডিকেল সার্ভিসেস অ্যান্ড হসপিটালের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্য, পরিবেশ, পানি উন্নয়ন, পৌরসভা ও ফায়ার সার্ভিস-সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সমন্বিত তদন্ত জরুরি। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগের সত্যতা না থাকলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবস্থানও স্পষ্ট করা উচিত।
চিকিৎসাসেবা মানুষের জীবন রক্ষার জায়গা। সেই জায়গায় অনুমোদন, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও আইনকানুনের কোনো ঘাটতি থাকলে তার দায় শুধু প্রতিষ্ঠানের নয়-তদারকিতে ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও।
