কাজী নূর
চাষি যখন উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম না পেয়ে মাঠেই তা কেটে সার তৈরি করছিল তখনই সবজির বাজার ভোক্তার নাগাল ছেড়ে যেতে পারে এমন আশংকা করেছিলেন সদরের চুড়ামনকাটি আব্দুলপুর এলাকার বাসিন্দা যশোর বড়বাজারের সবজি ব্যবসায়ী মুহাম্মদ ইন্তাজ আলী।
তিনি আরো বলেন, অনেক কষ্ট-শ্রম, অর্থ বিনিয়োগে উৎপাদিত পণ্য পরিবহন খরচ দিয়ে আড়তে এনে অন্ততপক্ষে খরচটায় যদি না ওঠে তাহলে তো কৃষক চাষাবাদে আগ্রহ হারাবে। আর সেই সুযোগে যখন বাজারে সরবরাহ কম হবে, স্বাভাবিকভাবে তখন সবজির দাম বৃদ্ধি হতে বাধ্য।
ইন্তাজ আলী আহবান জানিয়ে বলেন, আপনারা সাংবাদিক, শুধুমাত্র সবজির বাজার ওঠানামা সংক্রান্ত নয়, কৃষকের আদ্যোপান্ত নিয়ে লেখেন; কৃষককে বাঁচাতে সমাজ রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। একটি পরিবারের প্রধান কর্তা যদি ভালো থাকে তাহলে যেমন গোটা পরিবার নিশ্চিন্তে থাকে। তেমনি দেশের কৃষি ও কৃষক যদি ভালো থাকে তাহলে ভালো থাকবে গোটা বাংলাদেশ।
শুক্রবার সকালে যশোর শহরের হাজী মোহাম্মদ মহসিন রোড বড়বাজারে সরেজমিনে গেলে ইন্তাজ আলী, ইমদাদুল ইসলাম, জসিম উদ্দিনসহ কয়েকজন সবজি বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তবে তাদের প্রত্যেকেই একটি জায়গায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সেটি হচ্ছে, এমন ভরা মৌসুমে সবজির বাজার ঊর্ধ্বমুখী হলে আগামী গ্রীস্ম মৌসুমে এটি কোথায় গিয়ে ঠেকবে সেটি ভাববার বিষয়। তার উপর বড় কথা দাম বৃদ্ধি পেলে বিক্রি অনেক কমে যায়।
এদিন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে ফুলকপি মানভেদে কেজি প্রতি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, মিচুড়ি ৬০ টাকা, রেড কপি ৬০ টাকা, বেগুন ৫০ থেকে ৮০ টাকা, ব্রকলি ৬০ টাকা, করলা ৯০ টাকা, মটরসুটি ১২০ টাকা, শিম ৩০ থেকে ৪০ টাকা, মেটে আলু ৭০ থেকে ৮০ টাকা, মানকচু ৫০ থেকে ৬০ টাকা, ধনে পাতা ৫০ থেকে ৬০ টাকা, পেঁয়াজ কালি ২০ টাকা, মুলো ২০ টাকা, পালং শাক ২০ থেকে ৩০ টাকা, শালগম ৪০ টাকা, টমেটো ৭০ থেকে ৮০ টাকা, গাজর ৪০ টাকা, বিটরুট ৪০ টাকা, শষা ৫০ থেকে ৬০ টাকা, কচুর লতি ৭০ টাকা, মিষ্টি কুমড়ো ৩০ থেকে ৪০ টাকা, পুঁইশাক ২০ টাকা, কাঁচাকলা ৪০ টাকা, পেঁপে ৩০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১০০ থেকে ১২০ টাকা, শাকের ডাটা ৩০ টাকা ও কুশি ৭০ টাকা বিক্রি হয়েছে। এছাড়া লাউ পিস হিসেবে ৬০ থেকে ৮০ টাকা ও বাঁধাকপি ২০ টাকা পিস হিসেবে বিক্রি হয়েছে।
বাজারে নতুন আলু দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ২৫ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। এছাড়া পুরনো আলু ২০ টাকা, নতুন পেয়াজ ৫০ টাকা, রসুন ১০০ টাকা, আদা ১৬০ থেকে ২০০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
আলু-পেঁয়াজ বিক্রেতা সজিব হোসেন সুজন বলেন, বাজার স্থিতিশীল থাকলেও হঠাৎ আলুর দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সরবরাহ ঠিক থাকলে দাম কমতে পারে।
নিউ স্যাটেলাইট টাউন সেক্টর ২ এর বাসিন্দা চাকরিজীবী মীর হাবিবুর রহমান বলেন, এমন ভরা মৌসুমে সবজির দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে এটা মানা যায় না। দাম বৃদ্ধির কারন যাই হোক আয় ব্যয়ের একটা সামঞ্জস্যতা তো থাকতে হবে।
জানতে চাইলে সবজি বিক্রেতা মো. সোহেল বলেন, সাতমাইল বাজার, খাজুরা, বারোবাজার, মণিরামপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থানে উৎপাদিত সবজি যশোরের চাহিদা মেটায়। চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সবজি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায়। কিন্তু বর্তমানে চাহিদার বৃহৎ একটি অংশ যশোরে সরবরাহ হচ্ছে না। আবার ঢাকার পার্টিরা বসে থেকে রেটা বেশি দিয়ে মাল কিনে নিয়ে যায়। বিধায় চাহিদার তুলনায় যশোর বাজারে সরবরাহ কম থাকায় দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি আরো বলেন, চলতি সপ্তাহে দাম না কমলে সবজির বাজার আরো গরম হবার আশংকা রয়েছে।
মাছের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে আড়াই কেজি সাইজের রুই ৪০০ টাকা, ৪ কেজি সাইজের কাতলা ৪০০ টাকা, টেংরা ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা, গলদা চিংড়ি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, পাঙাশ ১৮০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, কৈ ২০০ টাকা, শিং ৪০০ টাকা, কাচকি ৭০০ টাকা, বেলে ৭০০ টাকা, বাটা ১৫০ টাকা, রায় বাটা ৪৫০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে।
মাছ বিক্রেতা জয় বিশ্বাস বলেন, মাছের বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। তবে কিছু মাছের দাম আজ বাড়তি। শুক্রবারের বাজারে এমন হয়ে থাকে।
শহরের ঘোপ পিলু খান রোডের বাসিন্দা ব্যবসায়ী খান ইনামুল কবীর বাংলার ভোরকে বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ যাবত মাছের বাজার স্থিতিশীল রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
মুরগির বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে ব্রয়লার কেজি প্রতি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা, সোনালী ২২০ থেকে ২৬০ টাকা, লেয়ার ৩২০ টাকা ও দেশি মুরগি ৫৫০ টাকা বিক্রি হয়েছে। মুরগির বাজার ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়ার মতো।
বিসমিল্লাহ ব্রয়লার হাউজের মালিক নুরুজ্জামান জনি বলেন, পাইকারি পর্যায়ে সব মুরগির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু খুচরা পর্যায়ে এখনো তেমন বাড়েনি। একদিকে তীব্র শীত তার উপর চলছে পিকনিক, বিয়ের মৌসুম। বাজারে চাহিদার তুলনায় মুরগির সরবরাহ কম। দাম বৃদ্ধি আশংকা রয়েছে জানিয়ে জনি আরে বলেন, এদিকে আমরা ঠিকমতো মাল পাচ্ছি না কিন্তু ঢাকার পার্টিরা মাল নিয়ে যাচ্ছে।
চালের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে মিনিকেট কেজি প্রতি ৬২ থেকে ৬৪ টাকা, বাসমতি ৭৮ থেকে ৮৪ টাকা, আটাশ ৫৬ থেকে ৫৮ টাকা, সুবললতা ৪৮ থেকে ৫০ টাকা, মোটা ৪৮ থেকে ৫০ টাকা ও নাজিরশাইল ৭৮ থেকে ৮০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
হাটচান্নী চাল বাজারের নিউ মা কালী ভান্ডারের পরিচালক অভিজিত সাহা বলেন, ধানের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। চালের দাম বৃদ্ধি পাবার আশংকা রয়েছে।
মুদিপণ্যের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে খোলা ভোজ্য সয়াবিন তেল ১৯২ টাকা কেজি ও বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৫ টাকা লিটার বিক্রি হয়েছে। এছাড়া সরিষার তেল ২২০ থেকে ২৩০ টাকা, পাম ১৭০ কেজি বিক্রি হয়েছে। অপরদিকে মুসুরের ডাল ৯০ থেকে ১৬০ টাকা, ছোলার ডাল ১১০ টাকা, মুগ ডাল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, বুটের ডাল ৬০ টাকা, সাদা চিনি ১০০ টাকা, লাল চিনি ১২০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে।
হাটচান্নীর মুদিপণ্য ব্যবসায়ী মানিক স্টোরের মালিক জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, সবকিছুর দাম মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। তবে এলাচের দাম দিনেদিনে নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ডিমের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে লাল ডিম হালি প্রতি ৩৬ টাকা, সাদা ডিম ৩৪ টাকা হালি বিক্রি হয়েছে।

