হিমেল খান :
জরুরি মুহূর্তে সংকটাপন্ন রোগীর জীবন বাঁচানোর অন্যতম ভরসা অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু যশোর জেলায় সেই অ্যাম্বুলেন্সই এখন রোগী ও স্বজনদের জন্য চরম মৃত্যুঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সেবা দেয়ার নামে সিংহভাগ বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে চলছে প্রতারণা।
কোনোটিতে খালি অক্সিজেন সিলিন্ডার বসিয়ে রাখা হয়েছে, আবার কোনোটিতে সিলিন্ডার থাকলেও নেই পর্যাপ্ত গ্যাস। এমনকি সিলিন্ডার ছাড়া শুধু খালি পাইপ রোগীর মুখে লাগিয়ে প্রতারণা করার ঘটনাও ঘটছে। অকেজো নেবুলাইজার আর জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামের অনুপস্থিতিতে ‘চলমান চিকিৎসা সেবা’র পরিবর্তে এসব অ্যাম্বুলেন্স পরিণত হয়েছে ঝুঁকি বাড়ানোর বাহনে।
সরকারি সংকটে বেসরকারি জিম্মিদশা
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যশোর জেলায় সরকারি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ১১টি। যার মধ্যে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের বরাদ্দ মাত্র ২টি। বিপরীতে জেলাজুড়ে চলছে প্রায় ৮০টি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স। বিশাল এই ঘাটতিকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে একটি সিন্ডিকেট।
জরুরি প্রয়োজনে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দূরত্ব যাই হোক না কেন, সিন্ডিকেটের নির্ধারিত চড়া ভাড়াই গুণতে হয় তাদের।
প্রতারণা ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখে রোগীরা
স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্সে পূর্ণ অক্সিজেন সিলিন্ডার, নেবুলাইজার এবং রোগী পরিবহনের উপযুক্ত বেডসহ জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ছদ্মবেশী অ্যাম্বুলেন্স: শহরের রনি হাসান ও শান্ত জানান, জরুরি মুহূর্তে অক্সিজেন চাইলে চালকরা খালি সিলিন্ডারের পাইপ লাগিয়ে রাখে, যা স্পষ্ট প্রতারণা।
সরঞ্জামহীন যান: রোকসানা পারভিন নামে এক ভুক্তভোগী জানান, গত ২৭ আগস্ট এক মুমূর্ষু রোগীর জন্য ডাকা অ্যাম্বুলেন্সে কোনো অক্সিজেন সিলিন্ডার বা নেবুলাইজার ছিল না। পর্যাপ্ত সাপোর্ট না পাওয়ায় অধিকাংশ সময় পথিমধ্যেই রোগীর মৃত্যু হয়।
অবকাঠামোগত অবৈধ পরিবর্তন: সরেজমিনে দেখা গেছে, মানদণ্ড না মেনে অগণিত সাধারণ মাইক্রোবাসের আসন ও কাঠামো রাতারাতি পরিবর্তন করে অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে রাস্তায় নামিয়ে দেয়া হচ্ছে।
চালকদের দায় এড়ানোর অজুহাত ও মালিক সমিতির অসংগতি
অবৈধ রূপান্তর ও সরঞ্জামহীনতার বিষয়ে জানতে চাইলে চালকরা দেন মনগড়া ব্যাখ্যা। সদ্য মাইক্রোবাস কেটে অ্যাম্বুলেন্স বানানো আল-আমিন নামে এক চালক জানান, কাঠামো পরিবর্তন করা হয়েছে, লাইসেন্সও নাকি পরে পাওয়া যাবে!
যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের সামনে থাকা কাশেম নামে এক চালক দাবি করেন, অক্সিজেন সংকটের কারণে অনেক সময় বাধ্য হয়ে খালি সিলিন্ডার নিয়ে যেতে হয়। মিলন নামে অপর এক চালকের মতে, দক্ষতা ও সচেতনতার অভাবেই এ সংকট তৈরি হচ্ছে।
এদিকে বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতি যশোর জেলার সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম হিরক দাবি করেন, “প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্সে দুটি করে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডার থাকে।” তবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও সরেজমিন চিত্রে তার এই দাবির কোনো সত্যতা মেলেনি।
চিকিৎসকদের উদ্বেগ ও মনিটরিংয়ের তাগিদ
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ড. আহসান কবির বাপ্পি জানান, “সংকটাপন্ন রোগীর জন্য অ্যাম্বুলেন্স কেবল পরিবহনের মাধ্যম নয়, এটি চলমান চিকিৎসা সেবার অংশ। অধিকাংশ বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে ‘লাইফ সাপোর্ট’ না থাকায় মাঝপথেই রোগীরা দুর্ঘটনার বা মৃত্যুর শিকার হচ্ছেন। এই সংকট কাটাতে স্বাস্থ্য প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের যৌথ ও জোরদার মনিটরিং জরুরি।”
যশোরের সিভিল সার্জন মাসুদ রানা জানান, নিয়ম মেনেই বিআরটিএ থেকে পারমিট পাওয়ার কথা। কিন্তু বিআরটিএ কীভাবে এসব অনুমোদনহীন ও অবকাঠামো পরিবর্তিত যানের পারমিট দেয়, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
আইনগত ব্যবস্থার আশ্বাস
এ বিষয়ে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিরাজুল ইসলাম বলেন, “স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশিকা ও বিআরটিএর অনুমোদন ছাড়া যেসব অ্যাম্বুলেন্স সড়কে চলছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রয়োজনে অবৈধ রূপান্তরকারী ও অনুমোদনহীন যানের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হবে।”
জীবন বাঁচানোর তাগিদে স্বজনরা রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলেন। কিন্তু তদারকির অভাব ও সস্তা মুনাফার লোভে এই জরুরি সেবা যদি প্রতারণায় রূপ নেয়, তবে তা পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্যই বড় হুমকি। প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই অনিয়ম আরও বহু প্রাণ কেড়ে নেবে বলে আশঙ্কা ভুক্তভোগীদের।
