উর্মি ইমাম
তথ্যের অবাধ প্রবাহ যেমন নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে, তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-এর অপব্যবহার তথ্যের অখণ্ডতার সামনে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়েছে। প্রযুক্তির এই দ্বিমুখী লড়াইয়ে ‘ফ্যাক্ট চেকিং’ বা তথ্য যাচাই এখন আর কেবল পেশাদার সাংবাদিকদের কাজ নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক জরুরি প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে।
প্রযুক্তির দাপট ও তথ্যের সংকট
সাম্প্রতিক সময়ে ‘ডিপফেক’ ভিডিও এবং এআই দিয়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে খুব সহজেই একজনের কণ্ঠস্বর বা চেহারা নকল করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ আসল এবং নকল তথ্যের মধ্যে পার্থক্য করতে হিমশিম খাচ্ছেন। এটি কেবল ব্যক্তিগত মর্যাদাহানি করছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা বনাম অপপ্রচার
মত প্রকাশের স্বাধীনতা যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি। তবে তথ্যের অখণ্ডতা (Information Integrity) বজায় না থাকলে এই স্বাধীনতা বিপন্ন হতে পারে। যখন ভুয়া তথ্যের ভিড়ে প্রকৃত সত্য ঢাকা পড়ে যায়, তখন নাগরিকরা ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
আলোচকদের মতে, “মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানে এই নয় যে কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হলো মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার প্রথম শর্ত।”
রক্ষাকবচ হিসেবে ফ্যাক্ট চেকিং
এই সংকট উত্তরণে ফ্যাক্ট চেকিং বা তথ্য যাচাইকারী সংস্থাগুলো ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা হিসেবে কাজ করছে। এআই-এর মোকাবিলায় এখন এআই-কেই ব্যবহার করার প্রবণতা বাড়ছে। স্বয়ংক্রিয় টুলস ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যে কোনো সংবাদের উৎস এবং সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে।
তবে প্রযুক্তিবিদরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, কেবল প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করলেই হবে না। সাধারণ মানুষের মধ্যে মিডিয়া লিটারেসি বা তথ্য সচেতনতা বাড়াতে হবে। কোনো কিছু শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
আগামীর পথ
আসন্ন বছরগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরও শক্তিশালী হবে। তাই তথ্যের অখণ্ডতা বজায় রাখতে সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে একটি নিরাপদ ও সত্যনির্ভর ডিজিটাল বিশ্ব নিশ্চিত করা যায়, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
উল্লেখ্য এই প্রতিবেদনের তথ্য যাচাই (ফ্যাক্ট-চেকিং) ও প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় ১৯–২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে সাউথ এশিয়া সেন্টার ফর মিডিয়া ইন ডেভেলপমেন্ট (SACMID) ও ইউনেস্কো (UNESCO) আয়োজিত “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের অখণ্ডতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—ফ্যাক্ট-চেকিং” শীর্ষক প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান ও কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে।

