বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
একদিন নাহিদুর রহমানের কোলে মাথা রেখেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন মা। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মায়ের সেই বিদায় ছিল পরিবারের জন্য গভীর শোকের। কে জানত, একদিন সেই মায়ের কবরের পাশেই পাশাপাশি শায়িত হতে হবে নাহিদুর রহমান, তার স্ত্রী ও দুই অবুঝ মেয়েকে! কক্সবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নিয়েছে চার প্রাণ। বুধবার বিকেলে মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তারা চারজন।
বুধবার বিকেলে যশোরের মণিরামপুর পৌর শহরের মোহনপুরে বাঁধাঘাট ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। পাশাপাশি চারটি কবরে চিরবিদায় জানানো হয় নাহিদুর রহমান (৪১), তার স্ত্রী আফসানা মতিন তানজী (৩৬) এবং তাদের দুই মেয়ে রোজাইনা ইনায়া (৭) ও মুনাইনা ইহানাকে (৩)।
এর আগে বুধবার ভোরে চারজনের মরদেহ মোহনপুরে পৌঁছায়। প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা স্বজনেরা মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে এলাকার পরিবেশ। যে বাড়িতে চারটি প্রাণের পদচারণায় মুখর থাকার কথা, সেখানে নেমে আসে শোকের নিস্তব্ধতা।
প্রতিবেশীরাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
গত ১৭ অক্টোবর সকালে কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর নিখোঁজ হন নাহিদুর রহমান, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান।
ওই দিন রিসোর্টের একটি ওয়াশরুম থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আগুনে পুড়ে মরদেহগুলো এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে, তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এরপর শুরু হয় অপেক্ষা। প্রিয়জনেরা বেঁচে আছেন, নাকি আগুনের ভয়াবহতা তাদের কেড়ে নিয়েছে—এই অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটে পরিবারের সময়। শেষ পর্যন্ত ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে চারজনের পরিচয় নিশ্চিত হয়।
নিহতদের বড় ভাই জাহিদুর রহমান জানান, মঙ্গলবার বিকেলে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গ থেকে তার ছোট ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী ও দুই মেয়ের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ সময় কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান, পুলিশের বিশেষ পুলিশ সুপার (সিআইডি) মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমানসহ প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মতিয়ার রহমান বলেন, আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার আগের রাতে নাহিদের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়। তখন সে আমাকে বলেছিল, বাবা তুমি চিন্তা করো না। তোমার পুত্রনিরা সি-বিচে আছে, বাচ্চারা খেলছে। মঙ্গলবার ঢাকায় ফিরবো। বুধবার তুমি ঢাকার মিরপুরের বাসায় চলে যেয়ো।’ সেটাই ছিল শেষ কথা। আর কথা হবে না।
স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ছুটিতে গ্রামে এলে বাচ্চারা বাড়ি মাতিয়ে রাখতো। কত খেলতাম তাদের সঙ্গে! আর কিছুই হবে না। ফুলের মতো নিষ্পাপ বাচ্চারাও পুড়ে মারা গেছে। কত কষ্ট পেয়েছে আমার সোনার মানিকেরা!
মরদেহ শনাক্তের খবর পাওয়ার পর থেকেই পরিবারের পক্ষ থেকে নাহিদুর রহমানের মায়ের কবরের পাশে পাশাপাশি চারটি কবর খুঁড়া হয়। প্রিয়জনদের শেষ ঠিকানা যে এখানেই হবে, সেই নির্মম সত্য মেনে নেওয়া ছাড়া পরিবারের আর কোনো উপায় ছিল না।
পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে জানা যায়, ২০১৬ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত নাহিদুর রহমানের মা তার কোলে মাথা রেখেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। মায়ের সেই স্মৃতি বুকে নিয়ে জীবন চলছিল নাহিদুরের। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস—এবার সেই মায়ের কবরের পাশেই চিরবিদায় নিলেন তিনি, তার স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যা।
