কাজী নূর
বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় দাম বাড়ার কোনো আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ‘ভোজ্যতেলের সার্বিক সরবরাহ পরিস্থিতি’ পর্যালোচনা বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।
তবে, মঙ্গলবার যশোর শহরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে বাস্তব চিত্র ভিন্ন দেখা গেছে। বাজারে অতিরিক্ত মূল্যে তেল বিক্রির পাশাপাশি তেল নেই বলেও জানাচ্ছেন দোকানদাররা। এমনকি বোতলজাত সয়াবিন তেল সংকট চরম আকার ধারণ করেছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোম্পানি থেকে তেল সরবরাহ কম করা হচ্ছে এমনকি কোন কোন কোন কোম্পানি তেলের অর্ডারও নিচ্ছেন না।
যদিও সোমবার মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বর্তমানে বাজারে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টন ভোজ্যতেল মজুত রয়েছে এবং আরও ৩ লাখ ৬০ হাজার টন তেল আমদানির পাইপলাইনে রয়েছে। তিনি বলেন, সাময়িকভাবে কিছু জায়গায় সরবরাহের চাপ তৈরি হয়েছে কারণ অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনছেন। এলসি খোলার কার্যক্রমও স্বাভাবিকভাবে চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নিউজের ভিডিও দেখতে লিংকে ক্লিক করুন .. ..
মঙ্গলবার যশোর শহরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ২০৫ টাকা, সুপার তেল ১৬০ টাকা এবং পাম ওয়েল ১৫৩ টাকা লিটার দরে। অন্যদিকে সরিষার তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২৩০ থেকে ২৬০ টাকায়। বড় বাজারে তেল কিনতে আসা ক্রেতা ওহাব আনোয়ার বলেন, দাম কম বেশি হলেও আমাদের কিনতে হবে। কিন্তু বাজারের ব্যবসায়ীরা আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে তেলের দাম বাড়াচ্ছে। অনেক দোকানদার বলছে তেল সংকট, আবার কেউ কেউ বিক্রিও বন্ধ করে দিয়েছে। এতে আমাদের ভোগান্তি চরমে।
আরেক ক্রেতা মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ভোক্তা অধিকার সংস্থা বাজারে অভিযান চালিয়ে চলে যায়, কিন্তু পরে আর বাজার মনিটরিং করে না। অথচ জনগণের করের টাকায় তাদের বেতন হয়। তারা দায়িত্বশীল নয়।
স্কুলশিক্ষিকা ফাতিমা পারভীন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ পরিস্থিতিকে পুঁজি করে একটি চক্র অতিরিক্ত মুনাফা করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ঈদ সামনে অথচ যশোরের বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। একটি বোতল তেলও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে বড় বাজারের রশিদ স্টোরের মালিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে শিমুল স্টোরের মালিক শিমুল হোসেন বলেন, কোম্পানির লোকজন বোতলজাত তেল দিচ্ছে না, এমনকি অর্ডারও নিচ্ছে না। মনে হচ্ছে আগের মতো অন্য পণ্যের সঙ্গে বোতলজাত তেল বিক্রির কারসাজি করা হতে পারে। এতে আমরা ছোট ব্যবসায়ীরাও বিপাকে পড়েছি।
মেঘনা গ্রুপের বিক্রয় প্রতিনিধি বিপুল আহমেদ বলেন, সয়াবিন তেল বিক্রিতে লাভ কম বলে কোম্পানি মাল কম দিচ্ছে। আমরা পাইকারি ১৭৫ টাকা লিটার বিক্রি করতাম।
মুনিম স্টোরের বিক্রেতা হাজী মুনিম বলেন, প্রতি ড্রাম তেল ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তাই বাজারেও কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
গো-হাটা রোডের হাজী আলী স্টোরের পাইকারি ভোজ্যতেল বিক্রেতা মোস্তাক আহমেদ জানান, এক ড্রাম (৮৪ কেজি) তেল ৩৬ হাজার ৭২০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। যা প্রতি কেজিতে প্রায় ১৮০ টাকা পড়ে। তিনি বলেন, মূলত তেলের দাম খুব বেশি বাড়েনি। তবে কয়েক দফায় কেজিতে প্রায় ৪ টাকা বেড়েছে। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তেল আছে। কিন্তু পরিবহন খরচ অনেক বেড়েছে। আগে এক গাড়ি তেল আনতে ১৭ হাজার টাকা লাগত, এখন ৩২ হাজার টাকা লাগে। স্বাভাবিকভাবেই এই অতিরিক্ত খরচ তেলের দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, খোলা তেলের সরবরাহ তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকলেও বড় কোম্পানির বোতলজাত তেল বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে ছোট ব্যবসায়ীরা যেমন ক্রেতা হারাচ্ছেন, তেমনি সাধারণ ভোক্তারাও পড়ছেন ভোগান্তিতে।
ভোক্তাদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বোতলজাত তেল মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে এবং বাড়তি মুনাফা লাভের চেষ্টা করছে। এজন্য বাজারে নিয়মিত তদারকি ও কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ভোক্তা অধিদপ্তর যশোরের সহকারী পরিচালক মো. সেলিমুজ্জামান বলেন, অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব। বাজারে ভোজ্য তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি বা বেশি দামে তেল বিক্রির সুযোগ নেই।

