বাংলার ভোর প্রতিবেদক
আদালতের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সাথে সাথেই যশোরের ভাতুড়িয়ায় গ্রামবাসী মুক্তেশ্বরীর অবৈধ দখল উচ্ছেদে নেমে পড়েছে। বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে বৃহস্পতিবার সাধারণ মানুষ মুক্তেশ্বরীর ভরাটকৃত অংশ খননে নেমে পড়েন। ঝুড়ি কোদালের পাশাপাশি দুটি স্কেভেটর দিয়ে নদী খনন শুরু করা হয়। এর আগে মঙ্গলবার (১৯ মে) সিনিয়র জেলা জজ বেগম মাহমুদা খাতুন সদর সিভিল জজ আদালতের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে দেন। ফলে ওই জমির অবৈধ দখল উচ্ছেদের প্রতিবন্ধকতা অপসারিত হয়।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ধীরে ধীরে দখল প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একটি প্রভাবশালী চক্র যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া ও ভাতুড়িয়া পূর্বপাড়ার মাঝের মুক্তেশ্বরী নদীর সম্পূর্ণ অংশ ভরাট করে নেয়। এরপর গতবছর (২০২৫ সাল) জুলাই মাসে জমিতে প্লট তৈরি করে বিক্রির জন্য নোটিশ টাঙানো হয়। এ নিয়ে আগস্ট (২০২৫) মাসে সংবাদ প্রকাশ হলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এই দখল উচ্ছেদে স্থানীয়রা একাট্টা হলে জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভায় বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কমলেশ মজুমদারের নেতৃত্বে চার সদস্যের এই কমিটি মুক্তেশ্বরী দখলের তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করে। এই প্রতিবেদনে মুক্তেশ্বরী নদী দখলের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন আমলে নিয়ে ২৯ অক্টোবর’২৫ নদী রক্ষা কমিটির সভায় তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. আজাহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে সিদ্ধান্ত হয়, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড দ্রুততার সাথে উক্ত ভরাটকৃত অংশ পুনঃখননের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং প্রয়োজনী ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ সহায়তা প্রদান করবেন।’
এদিকে, নদী রক্ষা কমিটির এই সিদ্ধান্তের পর পদক্ষেপ গ্রহণের বিলম্বের সুযোগে গত ১ ডিসেম্বর যশোর সদর সিভিল জজ আদালতের দ্বারস্থ হন জমির রেকর্ডধারী মোস্তফা জামাল উদ্দিন। এই মামলার রায়ে গত ৭ মে আদালত নদীর দখল উচ্ছেদে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেন।
এই নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে জেলা জজ আদালতে আপিল করেন সংশ্লিষ্ট আদালতের জিপি অ্যাড. শেখ আব্দুল মোহাইমেন। আদালতের বিচারক সিনিয়র জেলা জজ বেগম মাহমুদা খাতুন আপিল আমলে নিয়ে প্রতিবেদন ও নথিপত্র যাচাই বাছাই করে দখলকৃত জমির অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেন। একইসাথে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর শুনানির দিন ধার্য করেন।
এদিকে, জেলা আদালতের এই আদেশে বিল হরিণাপাড়ের মানুষের মাঝে উচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়। রায়ের কপি হাতে পেয়েই বৃহস্পতিবার ভোরে মুক্তেশ্বরী পাড়ের বিল হরিণার বাসিন্দারা নেমে পড়েন অবৈধ দখল উচ্ছেদে। ঝুড়ি কোদালের পাশাপাশি স্কেভেটর দিয়ে তারা নদী খনন শুরু করেছেন।
ভাতুড়িয়া এলাকার বাসিন্দা মাসুদুর রহমান জানান, হরিণার বিলপাড়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মুক্তেশ্বরীর এই প্লট অপসারণের জন্য আন্দোলন করে আসছেন। জেলা জজ আদালতের রায়ের পর গ্রামবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদ শুরু করেছে।
একই এলাকার বাসিন্দা তৌহিদুর রহমান জানান, জমি জালিয়াত চক্রটিকে আদালতের মাধ্যমে সময় ক্ষেপনের চেষ্টা করছেন। এর মাধ্যমে তারা দখল বজায় রাখতে চান। কিন্তু আদালতের রায়ের পর গ্রামবাসী নদী খনন শুরু করে দিয়েছে। এখন দ্রুত খনন করে নদীর দুই প্রান্ত সংযুক্ত করা হলে বিলের আটকে থাকা পানি নেমে যাবে এবং চাষাবাদ সম্ভব হবে।
বিল হরিণা বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক শেখ রাকিবুল ইসলাম নয়ন বলেন, আদালতের নিষেধাজ্ঞায় গ্রামবাসী হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু জেলা জজ আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পরপরই অবৈধ দখল উচ্ছেদে খনন শুরু হয়েছে। নদী খনন হলে জলাবদ্ধতার কারণে এক ফসলি জমিতে পরিণত হওয়া প্রায় চার হাজার বিঘা জমি আবারও তিন ফসলিতে পরিণত হবে। খনন শুরু হওয়ায় বিল পাড়েরর হাজার হাজার কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে।

