হিমেল খান
পবিত্র ঈদুল আজাহাকে সামনে রেখে যশোরের কোরবানির হাটগুলোতে শেষ মুহূর্তের বেচাকেনা জমে উঠেছে। জেলার বিভিন্ন হাটে এখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে পশু কেনাবেচা, দরদাম আর ক্রেতা বিক্রেতাদের ব্যস্ততা।
তবে শেষ মুহূর্তের বাজারে পশু সরবরাহে স্বস্তি থাকলেও, দাম নিয়ে চলছে ক্রেতা বিক্রেতাদের মধ্যে টানাপোড়ন। বিশেষ করে হাটে ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের আধিপত্যের অভিযোগ তুলছেন সাধারণ ক্রেতারা। তাদের দাবি, খামারিদের কাছ থেকে কম দামে পশু কিনে অতিরিক্ত মুনাফায় আশায় হাটে বেশি দাম হাঁকাচ্ছেন তারা।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুয়ায়ী, যশোর জেলার আট উপজেলায় মোট ১৯টি পশুর হাট বসেছে। এর মধ্যে যশোর সদর উপজেলায় ছয়টি, কেশবপুর, চৌগাছা, ঝিকরগাছা ও শার্শায় একটি করে, মণিরামপুরে তিনটি, অভয়নগরে দুটি এবং বাঘারপাড়ায় চারটি পশুর হাট রয়েছে।

হাটগুলোতে ঘুরে দেখা যায়, এবারের কোরবানির বাজারে ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সীমিত বাজেটের কারণে বড় গরুর বদলে ছোট ও মাঝারি আকারের পশুর দিকে ঝুঁকছেন। অন্যদিকে বড় গরুর সামনে ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম।
সাতমাইল হাটে বড় গরু বেশি কিন্তু ক্রেতা কম :
শার্শা উপজেলার সবচেয়ে বড় পশুর হাট বাগঅঁচড়া সাতমাইল পশুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, দেশীয় খামারিদের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের ছোট খামারিদের কাছ থেকে বিপুল সংখ্যক গরু কিনে হাটে তুলেছেন ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা।
এ হাট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, গত বছরের তুলনায় এবার পশুর সরবরাহ অনেক বেশি। তবে বড় আকারের গরু থাকলেও সেগুলোর সামনে ক্রেতা কম।
হাটে ছোট গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত। মাঝারি গরুর দাম দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা। আর ৩০ থেকে ৫০ মণ ওজনের বড় গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে পাঁচ লাখ থেকে ১৪-১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত।
হাট সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার কোরবানির বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে ছোট ও মাঝারি আকারের পশুর। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বাজেট বিবেচনায় ছোট ও মাঝারি আকারের পশুর দিকে ঝুঁকছেন।
পুটখালী গ্রামের খামারি কাশেম আলী জানান, তিনি দুটি গরু হাটে তুলেছেন। একটি বড়, অন্যটি মাঝারি আকারের। তার ভাষ্য, বড় গরুর তুলনায় মাঝারি গরুর প্রতিই ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি।

দাম নিয়ে ক্ষুব্ধ ক্রেতারা :
হাটে আসা অনেক ক্রেতাকে একাধিক গরু ঘুরে দেখতে দেখা যায়। কেউ দাঁত দেখে বয়স যাচাই করছেন, কেউ শরীরের গঠন দেখছেন, আবার কেউ দীর্ঘ সময় ধরে দরদাম করছেন। তবে অধিকাংশ ক্রেতার অভিযোগ, বাজারে পশুর সরবরাহ ভালো হলেও দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর থেকে আসা ক্রেতা ইনজামামুল হক বলেন, ছোট আকারের একটা গরু কিনেছি ৩৭ হাজার টাকায়। ওজন হবে এক থেকে দেড় মণের মতো। দালালের কারণে বিক্রেতারা বাজারের তুলনায় অনেক বেশি দাম নিচ্ছেন। ঈদের কারণে বাধ্য হয়েই কিনতে হচ্ছে তাদের।
আরেক ক্রেতা নুরুল কাজী বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার গরুর দাম অনেক বেশি। আমাদের মতো ছোট পরিবারের জন্য মাঝারি গরুই ভরসা। বড় গরু কেনার সামর্থ্য নেই।
চৌগাছার দামদার বটতলা হাটেও একই চিত্র :
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বড় পশুর হাট চৌগাছার দামদার বটতলা হাটেও দেখা গেছে একই অবস্থা। চৌগাছা-মহেশপুর সড়কের পাশে বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে বসা এ হাটে সকাল থেকেই ছিল উপচেপড়া ভিড়।
হাট সংশ্লিষ্ট মোজাম্মেল হক তবি জানান, কোরবানির ঈদ উপলক্ষে এটাই ছিল শেষ হাট। শেষ দিনে প্রায় ১০ হাজার গরু ও এক হাজার ছাগল উঠেছে। প্রশাসনের পাশাপাশি তাদের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক দল নিরাপত্তায় কাজ করছে।
তবে হাট ঘুরে দেখা যায়, এ হাটেও ফড়িয়া ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেশি। বিভিন্ন এলাকা থেকে কম দামে গরু কিনে এনে তারা বাড়তি দামে বিক্রির চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ ক্রেতাদের।
হাটে গরু নিয়ে আসা এক ব্যবসায়ী ইকবাল জানান, তিনি খামার থেকে তিনটি ছোট গরু কিনে এনে ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকাচ্ছেন। গরুগুলোর আনুমানিক ওজন ৪ থেকে ৫ মণ।
আরেক ব্যবসায়ী মনিরুল বলেন, বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে গরু কিনেছি। বেশি দামে বিক্রি না করলে লাভ থাকবে না। তাই দাম বাড়িয়ে বলতে হচ্ছে।

ফড়িয়াদের কারণেই বাজার অস্থির :
হাটে ঘুরতে আসা রায়হান নামে এক ক্রেতা বলেন, সব কিছুর দাম বাড়ছে। তাই কোরবানির বাজেট সীমিত রাখতে হচ্ছে। ৩ থেকে ৪ মণের মধ্যে ভালো গরু পেলেই কিনবো। তবে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত দাম চাচ্ছেন বলেও তিনি জানা।
উপশহর এলাকা থেকে আসা শাহীন নামে আরেক ক্রেতার অভিযোগ, হাটে বেশিরভাগ গরু এখন ফড়িয়াদের হাতে। তারা খামারিদের কাছ থেকে গরু কিনে বেশি দামে বিক্রি করছে। কোরবানির ঈদ উপলক্ষে বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে তাদের।
শুধু চৌগাছা নয়, যশোরের অন্যান্য হাটেও একই অভিযোগ পাওয়া গেছে। অধিকাংশ ক্রেতার দাবি, ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যের কারণেই পশুর বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষকে বাড়তি দামে কোরবানির পশু কিনতে হচ্ছে।
গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধির প্রভাব বলছেন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা :
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা সিদ্দীকুর রহমান বলেন, হাটে দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বলছেন গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পশু পালনের খরচ বেড়েছে। সেই প্রভাব কোরবানির বাজারেও পড়েছে। তবে জেলায় পশুর সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

