শ্যামনগর সংবাদদাতা
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী শারমিন আক্তার চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সময় শ্রুতি লেখক (স্ক্রাইব) সংক্রান্ত জটিলতায় বারবার হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে তিনি সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
বুধবার শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাবে মাকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের জীবনের সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন শারমিন। তিনি উপজেলার সুন্দরবন-সংলগ্ন পশ্চিম কৈখালী এলাকার আব্দুল মজিদ কারিগরের মেয়ে।
শারমিন জানান, মাত্র আট বছর বয়সে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান। এরপর তার বাবা চোখের চিকিৎসার জন্য সর্বস্ব ব্যয় করলেও দৃষ্টিশক্তি আর ফিরে পাননি।
এ ঘটনায় তার বাবা শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তার বড় ভাই। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি ও কৃষিকাজ করে তিনি শারমিনের শিক্ষাজীবন চালিয়ে যেতে সহায়তা করেন।
দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পরিবারের সহযোগিতা ও ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় লেখাপড়া চালিয়ে যান শারমিন। তিনি স্থানীয় কৈখালী এস.আর. মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ঢাকার ডেমরার বেগম বদরুন্নেছা মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সেখান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
শারমিন বলেন, “ছোটবেলায় চোখের দৃষ্টি হারালেও পড়াশোনা করার স্বপ্ন হারাইনি। অনেক কষ্ট ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছি। পরিবারে অসুস্থ বাবা ও স্বজনদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য একটি চাকরি পেতে চাই। কিন্তু নিয়োগ পরীক্ষাগুলোতে শ্রুতি লেখক নিয়ে নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছি।”
তিনি অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে তার অনুমোদিত শ্রুতি লেখককে ব্যবহার করতে দেয়া হয় না। পরিবর্তে কর্তৃপক্ষের দেয়া ব্যক্তিকে নিয়ে পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয়। এতে প্রশ্ন সঠিকভাবে বোঝা এবং নির্ধারিত সময়ে উত্তরপত্র সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, “আমার নিজস্ব শ্রুতি লেখক আমার প্রয়োজন ও সক্ষমতা সম্পর্কে অবগত। কিন্তু অন্য কাউকে দিয়ে পরীক্ষা দিতে গেলে প্রশ্ন বুঝতে এবং উত্তর লিখতে সমস্যা হয়। ফলে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।”
শারমিন জানান, সর্বশেষ গত ১৬ মে বাংলাদেশ রেলওয়ের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে ডেমরার সৈয়দ শামসুল হক স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে নিজস্ব শ্রুতি লেখক নিয়ে উপস্থিত হন। কিন্তু সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা তাকে পরীক্ষা দিতে বাধা দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। একপর্যায়ে পরীক্ষা না দিয়েই কেন্দ্র ত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি।
তিনি বলেন, “আমি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় কাঠামোগত ও প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হচ্ছি। আমি চাই, আমার মতো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যেন কোনো ধরনের বৈষম্য বা হয়রানি ছাড়াই চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান।”
এ বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করে প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থীদের জন্য পরীক্ষার পরিবেশ আরও সহায়ক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার আহবান জানিয়েছেন।

