রেহেনা ফেরদৌসী
ইংরেজি মাধ্যমের জনপ্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ম্যাক মাস্টার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে এক বর্ণাঢ্য ও মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। “মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা” — এই আহ্বানে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ কে বরণ করে নিতে রাজধানীর খ্যাতনামা ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল ম্যাক মাস্টার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রাঙ্গণ রূপ নিয়েছিল এক টুকরো শাশ্বত বাংলায়। সোমবার সকালে প্রধান শিক্ষিকা এবং অন্যান্য সকল শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক আয়োজনের মূল সুরই ছিল একটাই — ইংরেজি মাধ্যমে পড়লেও শিকড়টা এই মা আর মাটিতেই। শিক্ষক, শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের সক্রিয় ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো আয়োজনটি এক উৎসবমুখর ও হৃদয়গ্রাহী পরিবেশে পরিণত হয়। সোমবার সকালে স্কুলের সুবিশাল অডিটোরিয়ামে পরিবেশিত হয় এক মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
লাল-সাদা শাড়ি-পাঞ্জাবিতে সজ্জিত শিক্ষার্থীরা আর ঐতিহ্যবাহী পোশাকে শিক্ষক-শিক্ষিকারা অনুষ্ঠানস্থলকে রূপ দিয়েছিলেন নববর্ষের আমেজে।অনুষ্ঠানের শুরুতেই বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ তাঁর স্বাগত বক্তব্যে বলেন, “ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা যখন রবীন্দ্র-নজরুলের গানে, বাউলের সুরে বাঙালি সংস্কৃতিকে ধারণ করে, তখনই প্রমাণ হয় শিকড়ের টান কতটা গভীর।”তিনি আরো বলেন, “গ্লোবাল সিটিজেন তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য, কিন্তু সেই নাগরিকের হৃদয়ে যেন বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর মূল্যবোধ অটুট থাকে সেটাই আজকের আয়োজনের মূল বার্তা।”
এরপরই মঞ্চে ওঠে স্কুলের ক্ষুদে শিল্পীরা। সমবেত কণ্ঠে “এসো হে বৈশাখ” গানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল আয়োজন। জুনিয়র সেকশনের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় “আমরা সবাই রাজা” নৃত্যনাট্য উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করে। সিনিয়র শিক্ষার্থীদের নজরুলগীতি “রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায়” ও রবীন্দ্রসঙ্গীত “আলো আমার আলো” এর সুরে হলভর্তি দর্শক একাত্ম হয়ে ওঠে।অনুষ্ঠানের সবচেয়ে উপভোগ্য অংশ ছিল শিক্ষক-শিক্ষিকাদের যৌথ পরিবেশনা।পাশাপাশি ছিল ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচ, ঢাকের তালে নাচ এবং শিক্ষার্থীদের নিজ হাতে আঁকা আলপনা প্রদর্শনী। স্কুল চত্বরে বসানো হয়েছিল বৈশাখী মেলা, যেখানে মাটির পুতুল, হাতের কাজ আর পিঠা-পায়েসের স্টল।দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রায়না আমব্রীন বলেন,”আমরা ক্লাসে ইংরেজিতে কথা বলি, কিন্তু আজ মনে হলো বাংলা ভাষাটাই আমাদের সবচেয়ে আপন।”অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের মাঝে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী চেতনা জাগ্রত করা, নিজস্ব সংস্কৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করা এবং “মা ও মাটি”র সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত থাকার অনুভূতি গড়ে তোলা।তাই প্রতিটি পরিবেশনায় ছিল বাঙালির ঐতিহ্যের ছোঁয়া, যা দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।শিক্ষকদের আন্তরিক দিকনির্দেশনা, পরিশ্রম ও নিষ্ঠার ফলে পুরো অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে শৃঙ্খলাপূর্ণ ও নান্দনিকভাবে সমৃদ্ধ। বিশেষ করে নবীন শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। উপস্থিত অভিভাবক ও অতিথিরাও শিক্ষার্থীদের এমন উপস্থাপনায় গভীরভাবে মুগ্ধ হন।অনুষ্ঠানের শেষে সকল শিক্ষার্থীকে বর্ষবরণ উপহার দেওয়া হয়।
ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার মধ্যেও নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধারণ ও লালন করার এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয় এবং অনুকরণীয়। শিক্ষার মাধ্যম ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু পরিচয় একটাই। আর সেই পরিচয় বাঙালি, সেই ঠিকানা বাংলাদেশ।

