বাংলার ভোর প্রতিবেদক
ঈদ মানেই আনন্দ, উৎসব,পরিবার-পরিজনের সঙ্গে খুশি ভাগাভাগি করার দিন। মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জন্য এটি সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। সারা মাস সিয়াম সাধনার পর যখন ঈদের চাঁদ আকাশে ওঠে, তখন শুধু শিশুরাই নয় প্রত্যেক মানুষের মনেই আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। কিন্তু সেই আনন্দের লাগামহীন ব্যয় আর অসহনীয় চাপ এসে ভর করে, তখন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের কাছে ঈদের উৎসব পড়েছে টানাপড়োনে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর কাছে ঈদের প্রস্তুতি মানেই সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশ। সীমিত আয়ের মধ্যেই ঈদের পোশাক,ইফতার-সেহরির বিশেষ আয়োজন, অতিথি আপ্যায়নের খরচ সবকিছু সামলাতে হয়। শিশুদের আবদার মেটানো, পরিবারের সবার জন্য নতুন জামাকাপড় কেনা, আত্মীয়-স্বজনের জন্য উপহার কেনা এসবের পেছনে খরচ করতে গিয়ে প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে প্রতি মুহূর্তে হিসাব মেলাতে হয়। সেই হিসাবের খাতা ভারি করে তোলে।
কষ্টের কথা না যায় বলা, না যায় চাওয়া এমন মন্তব্য বেরিয়ে এলো একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত মোহম্মদ হাসানের মুখ থেকে। তিনি একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা। মা, স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে তার সংসার। মাসে বেতন সর্বসাকুল্যে ২২ হাজার টাকা। থাকেন যশোরে ভাড়া বাসায়। দুই সন্তানের মধ্যে ছেলে অষ্টম আর মেয়ে পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। প্রতি মাসে ছেলেমেয়েদের স্কুল ও প্রাইভেট টিউটরের বেতন মিলিয়ে খরচ পাঁচ হাজার টাকা। বাসাভাড়া দিতে হয় পাঁচ হাজার টাকা। অসুস্থ মায়ের ও নিজেদের প্রয়োজনীয় ওষুধের পেছনে যায় দুই হাজার টাকা। পানি, গ্যাস বিদ্যুৎ, ময়লা পরিষ্কারের বিলসহ অন্যান্য মিলিয়ে দুই হাজার টাকা। অফিসে যাতায়াত ও দুপুরের খাবার হিসেবে নিজের হাত খরচ রাখেন মাসে তিন হাজার টাকা। অবশিষ্ট থাকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। তা দিয়ে পরিবারের সবার খাওয়া-দাওয়ার জন্য মাসের বাজার ও অন্যান্য খরচ মেটাতে হয় হাসানকে।নিজের সংসারের হিসাব তুলে ধরে উল্টো জানতে চান- ‘কী খাই, তা আপনিই বলেন?’
ঈদের জন্য আয়োজন করতে গিয়ে টানাপড়েনে পড়ে আক্ষেপের সুওে মোহম্মদ হাসান বলেন, উপহার দিতে বাড়তি খরচ হবে বলে কোনও আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের বাসায় বা কোনও অনুষ্ঠানে যাই না। কোনও বিয়ে, জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও যাই না। এই হলো আমাদের জীবন। এর মধ্যেই আনন্দ খুঁজতে হয়।
তিনি বলেন, এখন বাজারে ঢুকলেই দেখা যায় প্রতিটি পোশাকের আকাশছোঁয়া দাম। ঈদের সময় পোশাকের দোকানগুলোতেও চলে অস্বাভাবিক দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতা। সাধারণ একটি পোশাকের দামও এমন পর্যায়ে চলে যায় যে মধ্যবিত্ত ক্রেতারা শুধু তাকিয়ে দেখে, কিন্তু কেনার সাহস পান না।
বড় সমস্যা হলো, মধ্যবিত্তরা কারও কাছে গিয়ে নিজেদের দুরবস্থার কথা বলতে পারেন না। নিম্নবিত্তদের পাশে স্বল্প পরিসরে ধণ্যাদের দাডায়। মধ্যবিত্তরা সেটাও পান না, আবার কষ্ট গোপন রাখার এক অলিখিত নিয়ম মেনে চলেন। তারা হাত পাততে চান না, লজ্জায় অনেক সুযোগ-সুবিধা নিতেও সংকোচ করেন। লাগামহীন ব্যয় তাদের জীবনে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেয়। ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর কাছে ঈদের প্রস্তুতি মানেই সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশ।