বাংলার ভোর প্রতিবেদক
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসার পর থেকে গত তিন দিনেও কাটেনি তেলের সংকট। তবে পাম্পগুলোতে নেই তেল সংগ্রহে বাইকারদের দীর্ঘ সারি।
এমন চিত্রে পাম্পে কর্মরত ও তেল সংগ্রহকারী সাধারণে ভাষ্য দাম বাড়ার ফলে হারিয়ে গেছে সিণ্ডিকেট করে তেল মজুদকরী চক্রটি। এখন প্রশাসন জোরালো অভিযান চালালে মজুদ করা তেল উদ্ধার করা সম্ভব হবে। যাতে উপকৃত হবে রাষ্ট্র ও জনসাধারণ উভয়ই। যদিও দাম বাড়ার পরেও তেলের সংকট কাটেনি এখনও পুরোপুরি।
দাম বৃদ্ধির পর থেকে গত দিন দিন যশোরের পাম্পগুলো ঘুরে দেখা গেছে জ্বালানী সংকটে অনেক পাম্প বন্ধ থাকছে। যেসব পাম্পে তেল আসছে বিশেষ করে অকেটন ও পেট্রল তা নিতে কাড়াকাড়ি নেই। তবে ডিজেলের অপ্রতুলতা এখনও থেকেই গেছে। এতে করে এ অঞ্চলের কৃষি, ব্যবসা এবং পরিবহন খাতে নেমে এসেছে স্থবিরতা।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই যশোরের নিউ মার্কেট এলাকার প্রান্তীক তেল পাম্প, মণিহার এলাকার মনিরউদ্দীন তেল পাম্প, যাত্রিক তেল পাম্প, গাড়িখানা রোডের তোফাজ্জেল হোসেন তেল পাম্প ঘুরে দেখা গেছে অধিকাংশ পাম্প বন্ধ। মনিরউদ্দীন পাম্পে ডিজেল নিতে বাস, ট্রাকের লম্বা লাইন দেখা গেছে। অনেক পাম্প কর্তৃপক্ষ ‘তেল নেই’ বলে পাম্প বন্ধ রেখেছেন।
যা সাধারণ চালকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। তবে কোন পাম্পেই আগের মত লম্বা লাইন বা তেল মজুদ সিন্ডিকেটের তৎপরতা দেখা মেলেনি। যশোরের পাম্পগুলোতে তেল মজুদ সিণ্ডিকেটের উপস্থিতি নিয়ে একাধিক সংবাদ প্রকাশ করেছে বাংলার ভোর।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যা সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ বলেই প্রমাণিত হচ্ছে। এ অবস্থায় মোটরসাইকেল চালক ও ট্রাক চালকদের অভিযোগ, দাম যখন কম ছিল তখনও তেল লুকানো হয়েছিল। এখন দাম বাড়ার পরও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাখা হয়েছে।
মণিহার এলাকায় তেল নিতে আসা ট্রাক চালক আজগর আলী বলেন, ডিজেলের দাম বেড়েছে তারপরও তেল পাম্প বন্ধ। দূর দূরান্তে মালামাল নির্দিষ্ট সময়ে না পাঠাতে পারলে ব্যবসায় ক্ষতি হয়। কাঁচা মাল লোড থাকলে তো গরমে পচে যাচ্ছে। সব তেল পাম্প আগের মত ২৪ ঘন্টা চালু থাকলে ভোগান্তি কম হতো।
শহরের নিউ মার্কেটের প্রান্তীক পাম্পে দুপুরে তেল কিনতে আসা জাফর ইকবাল বলেন, তেলের সিরিয়াল দিতে হচ্ছে বলে এতদিন বাইক কম চালিয়েছি। ভাবলাম তেলের দাম বেড়েছে সারাদিন পাম্প খোলা থাকবে।
দুপুর দুটোর সময় এসেও দেখি পাম্প বন্ধ। পাম্পে একটা লোকও নেই যার কাছে জানতে পারবো কখন তেল পাবো বা আসবে।
এদিকে, যশোর জেলা মাছ, ফুল এবং সবজি উৎপাদনের জন্য সারাদেশে বিখ্যাত। এখান থেকেই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কৃষি পণ্য রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় যায়। কিন্তু জ্বালানি সংকটে থমকে গেছে চাকা।
সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন কৃষি উদ্যোক্তারা। বর্তমানে এ অঞ্চলে ভুট্টার মৌসুম চলায় মাড়াই কাজে ডিজেলের ব্যাপক চাহিদা। সোলাইমান হোসেন নামে একজন কৃষি উদ্যোক্তা বলেন, আমরা ভুট্টা মাড়াই মেশিন চালাচ্ছি যা পুরোপুরি ডিজেলে চলে। আগে ডিজেল পাচ্ছিলাম না বলে কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
ভেবেছিলাম দাম বাড়লে হয়তো পাওয়া যাবে। কিন্তু এখন দাম বেড়েও তেল মিলছে না। একদিকে উৎপাদন খরচ আকাশচুম্বী। অন্যদিকে সময়মতো কাজ করতে না পেরে এ বছর বড় ধরনের লোকসানের মুখে আছি।
পরিবহন খাতেও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে সরাসরি। রোববার বিকেল থেকেই আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাস ভাড়া বৃদ্ধির গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিলো। বাস ভাড়া প্রায় দেড় গুণ বেড়েছে। তেলের দামের অজুহাতে যানবাহনের ভাড়া বাড়াতে ভোগান্তিতে সাধারণ পথচারীরা।
তন্ময় রায় নামে এক যাত্রী বলেন, বাসের ভাড়া বেড়েছে। শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়ার নিয়মও মানছে না। কিছু বলতে গেলে বাসের লোকজন বলছে তেলের দাম বেশি।
পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় যশোরের পাইকারি ও খুচরা বাজারে কাঁচামালসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। ট্রাক ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় সবজি ও মাছের দাম আগের চেয়ে কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়ে গেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ে দাম আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
মের্সাস মনির উদ্দীন পাম্পের ম্যানেজার মেহেদি হাসান জানান, ডিপো থেকে তেল সরববাহ বাড়ায়নি। আগেও যেমন তেল পেতাম ৬ হাজার লিটার অকটেন ৯ হাজার লিটার ডিজেল এখনও তাই পাচ্ছি। তবে, বাইকের সিরিয়াল দাম বাড়ার পরে অনেক কমেছে। ডিপো থেকে তেল সরবরাহ বাড়ালে দ্রুতই সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
যশোরের সাধারণ মানুষ ও উদ্যোক্তাদের দাবি, কেবল দাম বাড়িয়ে সংকট সমাধান সম্ভব নয়। তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করে দ্রুত বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করতে না পারলে এই অঞ্চলের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি ও বাণিজ্য খাত দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

