কাজী নূর
উপশহর ডিগ্রি কলেজ মাঠে তখন স্লোগানের ঢেউ। স্লোগানের শব্দ, পতাকার রঙ, মানুষের কোলাহলে মুখর যশোর। ঠিক সেই ভিড়ের মধ্যেই হঠাৎ থমকে যান অনেকেই। হাতে হাতে বেরিয়ে আসে মোবাইল ফোন। ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা পড়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য। সারা শরীর ধান দিয়ে মোড়ানো এক চলন্ত ধানক্ষেত। সেই ক্ষেতের এক হাতে জাতীয় পতাকা, অন্য হাতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছবি।
তিনি রবিউল ইসলাম। সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার ব্রজবাকসা গ্রামের একজন ভাজাপোড়া বিক্রেতা। রাজনীতি তার পেশা নয়, কিন্তু রাজনীতি তার জীবনের গল্পের অংশ। রবিউল বলেন, মনের তাগিদেই এই রূপ ধারণ করেছি। জিয়াউর রহমানকে মনেপ্রাণে ধারণ করি। তার সন্তান তারেক রহমানের জনসভায় প্রাণের টানেই এসেছি।
এই দিনের জন্য তিনি প্রস্তুতি নিয়েছেন বেশ কিছু দিন ধরে। দোকান বন্ধ রেখেছেন, ধান সংগ্রহ করেছেন, নিজের শরীর ধীরে ধীরে ঢেকে ফেলেছেন শীষে শীষে। সোমবার ভোর ৬টায় একাই রওনা দেন কলারোয়া থেকে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে দাঁড়ান মঞ্চের কাছাকাছি।
২০১৩ সালের কথা মনে পড়ে তার। সে সময় তিনি আওয়ামী লীগের নেতা নামধারী সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন। শারীরিক যন্ত্রণা আর মানসিক ক্ষত নিয়ে কেটেছে বহুদিন। তবুও রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাননি। বরং সেই কষ্টই তাকে আরও দৃঢ় করেছে বলে জানান তিনি।
রবিউলের আশপাশে ভিড় জমে যায়। কেউ ছবি তোলে, কেউ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। কেউ কেউ চুপচাপ মাথা নেড়ে সম্মান জানান।
এদিকে, বাঘারপাড়া উপজেলার কৃষকদলের কর্মী হান্নান সরদার মাথায় ধানের চরকা নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, আমার পরিবার বিএনপির রাজনীতি করে। বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে ভালোবেসেই এসেছি।
শুধু রবিউল, হান্নান নয় ধান মানবের বেশ ধরে এসছিলেন, যশোর সদর উপজেলার হৈবতপুর ইউনিয়নের বালিয়াঘাট এলাকার মোসলেম আলী ও আবুল হোসেন। ষাটোর্ধ বয়স্ক এই দুইজন ধান মানবের বেশ ভূষা দেখে সেলফি তুলতে ভিড় জমান অনেকেই। মোসলেম আলী ও আবুল হোসেন বলেন, আমরা যুগ যুগ ধরে বিএনপি করি। জিয়ার আমল থেকে আমরা বিএনপির ভক্ত। জিয়ার ছেলে যশোরে আসায় আমরা অনেক খুশি।
ধান মানবের পাশেই আরেক দৃশ্য চোখ ভিজিয়ে দেয়। সেটি ছিল আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাজে ছোট ছোট শিশুর। মাথায় সাদা ওড়না, চোখে চশমা। যেন স্মৃতির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা কোনো ছবি।
কেশবপুরের জান্নাতুল জারা তাদেরই একজন। পরিবারের হাত ধরে জনসভায় এসেছে সে। জান্নাতুল বলে, আমি খালেদা জিয়ার সাজে এসেছি। তারেক রহমানকে দেখতে এসেছি।
বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই পরিবারের সঙ্গে এমন সাজে এসছে ছোট্ট শিশুটি।
শুধু জান্নাতুল নয় এমন সাজে আরও অনেক শিশু মাঠজুড়ে ঘুরে বেড়ায়। কারো গায়ে সাদা শাড়ির আদল, কারো চোখে চশমা। আবার কারো গায়ে হালকা গোলাপী রঙের শাড়ি। তাদের সঙ্গে বাবা-মা, স্বজনেরা। রাজনীতি এখানে শুধু স্লোগান নয়, স্মৃতি আর আবেগের উত্তরাধিকার। সভায় বক্তব্যের একপর্যায়ে এসব শিশুদের দেখে হাত নেড়ে তাদেরকে শুভেচ্ছাও জানান বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
এদিকে, ঐতিহাসিক জনসভায় তুতীয় লিঙ্গের কর্মী সমমর্থকদেরও দেখা যায়। বেনাপোল থেকে জনসভায় আসা তৃতীয় লিঙ্গের জামিলা বলেন, আমি যশোরে তারেক রহমানকে দেখতে এসেছি। এর আগে যে দিন তিনি ঢাকায় প্রথম এসেছিলেন সেদিনও আমি ঢাকায় গিয়েছিলাম। দলের প্রতি টানের জন্য আমি বারবার তার জনসভায় ছুটে যাই।
তপ্ত দুপুরে প্রথম বারের মত যশোরের জনসভায় পৌঁছান তারেক রহমান। নেতাকর্মীদের স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মাঠ। কিন্তু সেই কোলাহলের মাঝেও আলাদা করে চোখে পড়ে যায় ধানে মোড়া রবিউল, খালেদা জিয়ার সাজে শিশুরা, মাথায় চরকা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষকরা।
এই জনসভা শুধু রাজনৈতিক সমাবেশ নয়। এটা হয়ে ওঠে মানুষের গল্পের জায়গা। কারো কাছে এটি ভালোবাসার প্রকাশ। কারো কাছে প্রতিবাদের ভাষা। আবার কারো কাছে দীর্ঘ কষ্টের পর দাঁড়িয়ে থাকার এক নীরব ঘোষণা।
যশোরের উপশহর ডিগ্রি কলেজের মাঠে এদিন রাজনীতির পাশাপাশি দেখা যায় মানুষের মন। ধানের শীষের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে থাকা স্মৃতি, বিশ্বাস আর একরাশ অনুভূতি।
