স্বাধীন মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সোমবার প্রথমবারের মতো যশোরের মাটিতে পা রাখেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এদিন দুপুরে যশোর শহরতলীর উপশহর ডিগ্রি কলেজ মাঠে আয়োজিত ঐতিহাসিক নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন তিনি। জনসভায় তারেক রহমান আগামীর বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা ঘোষণার পাশাপাশি নারী অধিকার রক্ষা এবং দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে আপসহীন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
বক্তব্যের শুরুতেই তারেক রহমান দেশের নারী সমাজের মর্যাদা রক্ষায় বিএনপির অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল আমাদের মা-বোনদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে এবং তাদের পুনরায় ঘরের চার দেয়ালে বন্দি করতে চাচ্ছে। কিন্তু আমাদের পরিস্কার কথা দেশকে যদি প্রকৃত অর্থে গড়তে হয়, তবে নারী-পুরুষকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে।
তিনি একটি দলের শীর্ষ নেতার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, একটি দলের প্রধান বিদেশি মিডিয়ায় দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন যে তারা ক্ষমতায় গেলে নারীদের অনেক সম্মান দেবেন। অথচ সেই নেতাই সামাজিক মাধ্যমে কর্মজীবী নারীদের সম্পর্কে অত্যন্ত আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। যারা নারীদের নিয়ে এমন হীন মানসিকতা পোষণ করে। তারা ক্ষমতায় গিয়ে দেশকে ভালো কিছু দিতে পারবে না। এখন তারা জনগণের সামনে ‘অ্যাকাউন্ট হ্যাক’ হওয়ার যে মিথ্যা অজুহাত দিচ্ছে। আইটি বিশেষজ্ঞরা প্রমাণ করেছেন তা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও জলজ্যান্ত মিথ্যা।
নারীদের ক্ষমতায়নে বিএনপি সরকারের অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারেক রহমান বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া নারীদের শিক্ষিত করতে মেয়েদের শিক্ষা ফ্রি করে দিয়েছিলেন। ইনশাআল্লাহ, এবার বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে আমরা সকল মা-বোনের হাতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পৌঁছে দেব। এ ছাড়া গরিব ও দুস্থদের জন্য বিশেষ সহায়তার পাশাপাশি কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা হবে।
আগামী ১২ তারিখের নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্ক করে তিনি বলেন, বিগত সরকারের আমলের মতো ‘আমি-ডামি’ আর রাতের ভোট করে মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়ার দিন শেষ। একটি দল এখন নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে উঠেপড়ে লেগেছে। শুনছি তারা এখন বলছে ভোট গণনা করতে দেরি হবে। ভোট গণনার নামে যদি কেউ কোনো সুযোগ বা কারচুপি করতে চায়, তবে তাদের কঠোরভাবে প্রতিহত করতে হবে। আগামী ১২ তারিখে আপনারা শক্তি ও সাহস নিয়ে ভোটের মাঠে থাকবেন।
যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের উন্নয়নে একাধিক বড় প্রকল্পের ঘোষণা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খননকৃত সেই ঐতিহাসিক উলাশি খালসহ এই অঞ্চলের সকল খাল-বিল পুনরায় খনন করা হবে। জলাবদ্ধতা নিরসনে জিকে (গঙ্গা-কপোতাক্ষ) প্রকল্প পুনরায় চালু করা হবে। যশোরের বিখ্যাত ফুল বিদেশে রপ্তানির বিশেষ উদ্যোগ নেবে বিএনপি সরকার। বন্ধ হয়ে যাওয়া এই অঞ্চলের চিনিশিল্পগুলো পুনরায় সচল করা হবে।
ধর্মীয় সম্প্রীতি নিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসব ধর্মের মানুষকে সাথে নিয়ে দেশ গড়বে। এমনকি মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন এবং অন্য ধর্মের পুরোহিতদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানীর ব্যবস্থা করা হবে।
সোমবার সকাল থেকেই যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের সাত জেলার ২২টি আসন থেকে নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে আসতে থাকেন। দুপুর সাড়ে ১২টার মধ্যেই পুরো উপশহর মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
যশোর সদর উপজেলার হৈবতপুর ইউনিয়নের বালিয়াঘাট এলাকার মোসলেম আলী ও আবুল হোসেন বলেন, আমরা যুগ যুগ ধরে বিএনপি করি। জিয়ার আমল থেকে আমরা বিএনপির ভক্ত। জিয়ার ছেলে যশোরে আসায় আমরা অনেক খুশি।
শিক্ষার্থী তাসফিয়া জামান বলেন, জুলাই আন্দোলনে রাজপথে লড়াই করেছি। আমরা তারুণ্য নির্ভর আগামীর বাংলাদেশ দেখতে চাই। তারেক রহমান আমাদের জুলাই আন্দোলনের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পারবেন এই বিশ্বাস নিয়েই উনাকে এক নজর দেখতে জনসভার মাঠে এসেছি।
কেশবপুর থেকে আসা কর্মী টিপু সুলতান ও বেনাপোলের কর্মী তৃতীয় লিঙ্গের জামিলা জানান, প্রিয় নেতাকে একনজর দেখতে তারা ফজরের নামাজের পর থেকেই মাঠে অবস্থান করছেন। তারেক রহমানকে ভালোবেসে, দলকে ভালোবেসে তাদের এই জনসভায় ছুটে আসা।
স্থানীয় বাসিন্দা খুশি আক্তার বলেন, আমাদের এলাকায় তারেক রহমান এসেছেন। এটা দেখার জন্য দুই দিন আগে থেকেই আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা বাড়িতে ভিড় করেছেন। আমরা বাসার ছাদে বসে উনাকে দেখেছি। আমাদের এলাকায় অনেকেই তাদের বাসাবাড়ির ছাদে বসে ছিলো। উনি যখন হেলিকপ্টারে এসে নেমেছেন ছাদের উপর থেকে আমরা হাত নেড়েছি।
বক্তৃতা শেষে তারেক রহমান যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের সাত জেলার ২২টি আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের মঞ্চে ডেকে নেন। তাদের হাতে ধানের শীষের প্রতীক তুলে দিয়ে জনতাকে তাদেরকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান। জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেরুল হক সাবুর সভাপতিত্বে এই জনসভাটি যশোরের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক সমাবেশে পরিণত হয়।
