বাংলার ভোর প্রতিবেদক
ঐতিহ্যবাহী যশোর ইনস্টিটিউট যশোরের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রিড়া চর্চার অন্যতম প্রাচীন ও গৌরবময় প্রতিষ্ঠান। এটি শুধুমাত্র একটি ক্লাব বা পাঠাগার নয় বরং এটি যশোরের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের ধারক ও বাহক।
যশোরের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও নাগরিক চেতনার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ইনস্টিটিউটে গত ছয় বছরে ঈর্ষণীয় উন্নয়ন হয়েছে। দীর্ঘদিন যশোরের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও নাগরিক চেতনার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ইনস্টিটিউটের কাছে যশোরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল টাউন হল ময়দানকে দখলমুক্ত করা।
যশোর ইনস্টিটিউটের মাঠের জমিতে সেই জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসা জেলা পরিষদকে হটিয়ে জমি বুঝে নেয়া হয়। এবং তা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। অবকাঠামো ঠিক রেখে স্বাধীনতা মঞ্চ সংস্কার করে দৃষ্টিনন্দন করে ব্যবহার উপযোগী করা হয়েছে।
পানি বেধে থাকা মাঠে মাটি ভরাট করে ব্যবহার উপযোগী করে মাঠের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ওই ছয় বছরে একাগ্রতা আগ্রহ ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অনেক অসাধ্য সাধিত হয়েছে। আগামী নির্বাচিত কমিটি এই উন্নয়নের ধারবাহিকতা অব্যাহত রাখবে এবং সদস্যদের আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডাক্তার আবুল কালাম আজাদ লিটু।
যশোর পাবলিক লাইব্রেরি (১৮৫৪), টাউন ক্লাব (১৯১৯) এবং নিউ আর্য থিয়েটার ১৯২৭ সালে। মূলত তিনটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ১৯২৮ সালে গড়ে ওঠে যশোর ইনস্টিটিউট’। বহুভাষাবিদ, সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদারের নব উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। তবে বিভিন্ন সময় নানা শক্তি এর সম্পদ ও সম্পতি অপব্যবহার ও অপশোসন করেছেন।
বিভিন্ন সময় উন্নয়নও ব্যাহত হয়েছে। নানা জটিলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অদূরদর্শীতার কারণে বিভিন্ন সময় প্রতিষ্ঠানটি তার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে স্থবির হয়ে পড়ে। সেই স্থবিরতা ভেঙে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয় গত ৬ বছরে। ২০২০ সালে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ডাক্তার আবুল কালাম আজাদ লিটুর নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদের উদ্যোগে ইনস্টিটিউটের অবকাঠামো, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও প্রশাসনিক কাঠামোয় আসে ইতিবাচক পরিবর্তন।
জেলা পরিষদের মার্কেট সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসন করে নিরাপত্তা ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে নির্মাণ করা হয় সীমানা প্রাচীর এবং হাঁটার সুবিধার্থে তৈরি করা হয় ওয়াকওয়ে। স্থাপন করা হয় টাওয়ার লাইট। নাট্যচর্চাকে নতুন গতি দিতে আধুনিকায়ন ও পুনঃনির্মাণ করা হয় নাট্যকলা সংসদ। যাতে করে দীর্ঘদিন তসবীর সিনেমা হল হিসেবে ব্যবহৃত ঐতিহাসিক ভবনটি ফিরে পায় মূল নাম। নতুন করে বি-সরকার মেমোরিয়াল হল সাইবোর্ড দিয়ে সেখানে গড়ে তোলা হয় ঘূর্ণায়নমঞ্চ। যা স্থানীয় নাট্যচর্চার জন্য একটি উন্মুক্ত ও আধুনিক পরিবেশ তৈরি করে। আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে সদস্যদের জন্য করা হয় অ্যাপস। যেখানে ঢুকে নাম বা মোবাইল নাম্বার দিলেই চলে আসে সদস্যের বিস্তারিত।
প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের গতি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংস্কার করা হয় অফিস এবং সাধারণ সম্পাদকের জন্য নির্মাণ করা হয় পৃথক দৃষ্টনন্দন কক্ষ। প্রতিষ্ঠানটির দাতা রায়বাহাদুর যদুনাথ মজুমদারের স্মরণে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয় যদুনাথ মেলা। একই সঙ্গে কবি আজীজুল হক স্মরণে কবিতা উৎসব, বরেণ্য নাগরিকদের সম্মাননা প্রদানসহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এসব উদ্যোগ যশোর ইনস্টিটিউটকে আবারও একটি প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত করে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ইনস্টিটিউটের পুকুরটিও দীর্ঘদিন ইজারার কারণে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। বর্তমান পর্ষদ সেটিকে ইজারামুক্ত করে সেখানে মাছ অবমুক্ত করেছে, ফলে প্রঙ্গণে একটি প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়।
ক্রিড়া বিভাগের আধুনিকায়নেও গুরুত্ব দেয়া হয়, যা তরুণ প্রজন্মের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও নেয়া হয় বেশ কিছু পুনর্গঠনমূলক উদ্যোগ। যশোর ইনস্টিটিউট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকা সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। একই সাথে উন্নত করা হয়েছে ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরির পাঠ পরিবেশ। নতুন বই সংযোজনের পাশাপাশি লাইব্রেরি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয়েছে একটি পরিচিতিমূলক ফলক, যা আগত দর্শনার্থীদের জন্য প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস ও পরিচয় সম্পর্কে ধারণা দেয়।
পাঠকদের সুবিধার জন্য ডিজিটাল ক্যাটালগ চালু করা হয়েছে। ফলে এখন একটি বই খুঁজতে পুরো তাক ঘেঁটে দেখতে হয় না। স্থানীয় কবি-সাহিত্যিকদের সাহিত্য আড্ডা শনিবাসরীয় হয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘দুর্বা’ পত্রিকার ধারাবাহিকতায় নতুন আঙ্গিকে ‘নৈকট্য’ নামে একটি সাহিত্যপত্র প্রকাশ করা হয়েছে, যা ইতোমধ্যে প্রশংসিত হয়েছে। লাইব্রেরি উন্নয়ন বিষয়ে একটি সেমিনার আয়োজন করা হয়, যেখানে যশোর জেলার বিভিন্ন উপজেলার লাইব্রেরি উদ্যোক্তারা অংশগ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের বেতন ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
দীর্ঘদিনের অনাদায়ী দোকান ভাড়া আদায় করে নতুন করে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করেছে। এছাড়া এখন নিয়মিত পাঠচক্র চলছে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে ‘বই পড়ো, জগতকে জানো’ প্রতিপাদ্যে নানা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। গত বছর শিশু লাইব্রেরির উদ্বোধন করা হয়েছে। যার চাঁদামুক্ত সদস্য সংখ্যা বর্তমানে এক হাজার ১শ’ ৪৮ জন।
এ ব্যাপারে কথা হয় যশোর ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক ডাক্তার আবুল কালাম আজাদ লিটু জানান, কমিটির সকলকে সাথে নিয়েই সাধ্য অনুযায়ী উন্নয়ন করার চেষ্টা করেছি। আর কাজ করতে গিয়ে অনেক বাধা ঝড় ঝঞ্ঝা সামনে এসেছে। যশোরের সাংস্কৃতিক সাহিত্যমোদী মানুষের জন্য সেসব বাধা উপেক্ষা করে মন থেকেই কাজ করেছি। তবে এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে। তিনি আশাব্যাদ ব্যক্ত করেন আগামী নির্বাচিত কমিটি উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত রাখবেন।
আরো সাফল্য বয়ে আনবেন ইন্সটিটিউটের জন্য, যশোরবাসীর জন্য। আগামীতে নির্বাচনের মাধ্যমে যারা দায়িত্বে আসবেন তারা এই প্রতিষ্ঠানকে আরও গতিশীল ও সদৃদ্ধ করবেন এমন দৃঢ় অশাবাদ ব্যক্ত করেন উন্নয়নের এই মাইলফলক প্রচারবিমুখ আবুল কালাম আজাদ লিটু। দুটি প্যানেল এবারে নির্বাচনে লড়ছেন।

