বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
সন্ধ্যা নামলেই যশোর শহরের ব্যস্ত সড়কগুলো যেন রূপ নেয় খোলা আকাশের নিচের এক বিশাল খাবার বাজারে। দড়াটানা, ডিসি অফিস মোড়, ঈদগাহ মোড়, মণিহার, চৌরাস্তা, জেল রোড, হাসপাতাল এলাকা, বেজপাড়া, মুজিব সড়ক, ভোলাট্যাংক রোড, রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন এলাকায় সারি সারি ফাস্টফুড ও ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকানে ভিড় জমে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও তরুণদের। কম দামে সহজলভ্য বার্গার, স্যান্ডউইচ, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ফুচকা, চটপটি ও নানা ধরনের ভাজাপোড়া খাবার মুহূর্তেই মেটাচ্ছে ক্ষুধা। কিন্তু এই সহজলভ্যতার আড়ালে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে এক নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি।
স্থানীয় চিকিৎসক, ভোক্তা ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, রাস্তার পাশের অনেক খাবারের দোকানে স্বাস্থ্যবিধির ন্যুনতম মানও অনুসরণ করা হয় না। অপরিস্কার পরিবেশ, দীর্ঘ সময় খোলা অবস্থায় খাবার রাখা, নিম্নমানের তেল ব্যবহার এবং দূষিত পানির কারণে এসব খাবার খেয়ে অসুস্থ হওয়ার ঘটনা বাড়ছে।
“নিয়মিত ফাস্টফুড খাওয়ার ফলে শিশুদের ওজনাধিক্য হয় যা পরবর্তীতে টাইপ টু ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ফ্যাটি লিভার হয় এবং কোলেস্টেরল বেড়ে যায়। স্মৃতিশক্তি কমতে থাকে, পড়াশোনা ও কোনো কাজের প্রতি আগ্রহ, মনোযোগ থাকে না। মস্তিষ্কের কর্মদক্ষতা কমে যায়”
-ডা. আফসার আলী
বাড়ছে পেটের রোগ
শহরের বিভিন্ন ক্লিনিক ও চিকিৎসা কেন্দ্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে পেটের ব্যথা, ডায়রিয়া, বমি, খাদ্যে বিষক্রিয়া এবং গ্যাস্ট্রিকজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। অনেক রোগীই চিকিৎসকদের জানিয়েছেন, অসুস্থ হওয়ার আগে তারা রাস্তার পাশের ফাস্টফুড বা খোলা খাবার খেয়েছিলেন।
বেজপাড়া এলাকার কলেজ শিক্ষার্থী রিফাত হোসেন বলেন, “বন্ধুদের সঙ্গে প্রায়ই ফাস্টফুড খাই। কয়েকদিন আগে রাস্তার পাশের একটি দোকান থেকে বার্গার খাওয়ার পর রাতে তীব্র পেটব্যথা ও বমি শুরু হয়। পরে চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়েছে।”
স্থানীয় চিকিৎসকদের মতে, খাবার তৈরির পর দীর্ঘ সময় খোলা অবস্থায় রাখা হলে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বংশবিস্তার করে। এছাড়া একই তেল বারবার ব্যবহার করলে খাবারে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
ধুলাবালি, ধোঁয়া আর মাছির মধ্যে খাবার
শহরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, অধিকাংশ অস্থায়ী খাবারের দোকান ব্যস্ত সড়কের একেবারে পাশে বসানো। সেখানে খাবার অনেক সময় খোলা অবস্থায় রাখা হয়। যানবাহনের ধোঁয়া, রাস্তার ধুলাবালি এবং মাছির সংস্পর্শে এসব খাবার সহজেই দূষিত হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রীস্মকালে উচ্চ তাপমাত্রার কারণে খাবার দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। অথচ অনেক দোকানে খাবার সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই। ফলে খাদ্যবাহিত রোগের আশঙ্কা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে শিশুরা
খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে। আগামী ৭ জুন বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে বিশ্বজুড়ে যে পরিমাণ মানুষের মৃত্যু ঘটে, তা যক্ষা, এইডস ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগে মৃত্যুর সংখ্যার তুলনায় কোনো অংশে কম নয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দূষিত খাবার ও পানিবাহিত রোগ যেমন ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস-এ, টাইফয়েড এবং সালমোনেলা ও ই-কোলাইয়ের মতো ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ লাখো মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বয়স্কদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৯ শতাংশ এই বয়সী শিশু হলেও খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্তদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডের রেজিস্ট্রার চিকিৎসক আফসার আলী বলেন, ফাস্টফুড এমন একজাতীয় খাবার যা খুব সহজে তৈরি করা যায় আর খেতেও ভিষণ মুখরোচক; কিন্তু এই ফাস্টফুড তৈরি হয় ক্ষতিকারক সব পদার্থ দিয়ে, এতে অতিরিক্ত চিনি, লবণ, হাইড্রোজেনেটেড তেল, কৃত্রিম রং, ট্রান্স ফ্যাট ও শর্করা থাকে; কিন্তু আয়রনের অভাব থাকে। এছাড়াও প্রিজারভেটিভ, আর্টিফিশিয়াল ফ্লেভার থাকে ও সিজনিং হিসেবে যে মনোসোডিয়াম গ্রুটামেট ব্যবহার করা হয় তা শিশুদের নিউরোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার ঘটায়।
তিনি আরও বলেন, নিয়মিত ফাস্টফুড খাওয়ার ফলে শিশুদের ওজনাধিক্য হয় যা পরবর্তীতে টাইপ টু ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ফ্যাটি লিভার হয় এবং কোলেস্টেরল বেড়ে যায়। স্মৃতিশক্তি কমতে থাকে, পড়াশোনা ও কোনো কাজের প্রতি আগ্রহ, মনোযোগ থাকে না। মস্তিষ্কের কর্মদক্ষতা কমে যায়।
চিকিৎসক আফসার আলী আরও বলেন, শিশুদেরকে তাই ঘরে তৈরি খাবারের দিকে আগ্রহী করে তুলতে হবে। ছোটবেলা থেকেই শিশুদেরকে ঘরে তৈরি মজার সব পুষ্টিকর খাবার সুন্দর করে সাজিয়ে দিতে হবে। এসব খাবারের মধ্যে কেক, প্যানকেক, খিচুড়ি, ডিম, আলুর চপ, টুনা স্যান্ডউইচ, ফিশ বা চিকেন কাটলেট, বুট বা গাজরের হালুয়া হতে পারে। অভিভাবকদের একটু সময় করে শুধু এসব পুষ্টিকর খাবার তাদের তৈরি করে দিতে হবে। বাহিরের খাবার কিনে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। শুধু তাই নয়, বড়দেরকেও শিশুদের সামনে ফাস্টফুড খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে কারণ শিশুরা অনুকরণপ্রিয়।
রাসায়নিক দূষণও বড় হুমকি
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১৯৪টি সদস্যরাষ্ট্রে পরিচালিত জরিপে খাবারে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও রাসায়নিক দূষণসহ ৪২ ধরনের খাদ্যবাহিত ঝুঁকি চিহ্নিত হয়েছে।
জরিপে দেখা গেছে, ২০২১ সালে খাদ্যজনিত মোট মৃত্যুর প্রায় ৭৩ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল রাসায়নিক দূষণ। বিশেষ করে অজৈব আর্সেনিক ও সিসার বিষক্রিয়ার কারণে ১০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব উপাদান হৃদরোগ, ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের মোট খাদ্যজনিত অসুস্থতার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এবং মৃত্যুর ৬০ শতাংশ ঘটে আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে। জলবায়ু পরিবর্তন, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনার বৈষম্য এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
এ বিষয়ে চিকিৎসক আব্দুল আল মামুন বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি খাদ্য প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে। তিনি আরও বলেন, প্রশাসনিক তদারকির পাশাপাশি ভোক্তাদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। খাবার কেনার আগে দোকানের পরিচ্ছন্নতা, খাবার সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং ব্যবহৃত উপকরণের মান সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।

