হাবিবুর রহমান, নড়াইল
নড়াইল জেলার সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার একমাত্র ভরসাস্থল ‘নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতাল’ এখন নিজেই নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। তীব্র চিকিৎসক ও জনবল সংকট, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং তীব্র শয্যা সংকটের কারণে হাসপাতালটিতে আসা রোগীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। ফলে জেলার প্রায় ১০ লাখ মানুষের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
১০০ শয্যার এই হাসপাতালে ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রতিদিন দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ রোগী ভর্তি থাকছে। এ অবস্থায় শয্যা না পেয়ে বাধ্য হয়ে অনেক রোগীকে হাসপাতালের মেঝে ও নোংরা বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে ভর্তি হওয়া নারী, শিশু ও বৃদ্ধ রোগীদের।
হাসপাতালে মঞ্জুরিকৃত পদের তুলনায় চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা অত্যন্ত কম। বিশেষ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের (কনসালট্যান্ট) বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ফলে জটিল ও গুরুতর রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাধ্য হয়ে খুলনা বা ঢাকা মেডিকেল কলেজে রেফার করতে হচ্ছে। চিকিৎসকদের পাশাপাশি আয়া, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তা প্রহরীর চরম সংকটের কারণে হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোর চিকিৎসাবান্ধব পরিবেশ ও সার্বিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের এক্স–রে মেশিন এবং আল্ট্রাসোনোগ্রাফি যন্ত্রসহ বেশ কিছু জরুরি পরীক্ষা–নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি প্রায়ই বিকল থাকে অথবা দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাবে বন্ধ থাকে। ফলে নিরূপায় হয়ে গরিব রোগীদের চড়া মূল্যে বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। এছাড়া সরকারি ওষুধ সরবরাহের তুলনায় রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হওয়ায়, কিছু ওষুধ হাসপাতালে পাওয়া গেলেও অধিকাংশ জরুরি ওষুধই রোগীদের বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ভুক্তভোগী রোগী সলেমান মিয়া জানান, ‘বেশিরভাগ ওষুধ হাসপাতাল থেকে দেয়া হলেও সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক সময় ডাক্তারের দেখা মেলে না। আর পরীক্ষা–নিরীক্ষার জন্য তো বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দৌঁড়াতে হয়। আমরা গরিব মানুষ, সরকারি হাসপাতালে এসেও যদি এভাবে বাইরে টাকা খরচ করতে হয়, তবে আমাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা থাকে না।”
এদিকে হাসপাতালের ধারণক্ষমতা বাড়াতে প্রায় ৬১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ৯ তলা বিশিষ্ট ২৫০ শয্যার নতুন আধুনিক ভবন নির্মাণ করা হলেও দীর্ঘ ৮ বছরেও তা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। মূল অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও মূলত লিফট স্থাপন ও নকশা জটিলতার কারণে গণপূর্ত বিভাগ ভবনটি স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করতে পারছে না। ফলে আধুনিক আইসিইউ সুবিধাসহ সুউচ্চ ভবনটি পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেও সাধারণ মানুষ এর কোনো সুফল পাচ্ছে না।
হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি ও দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আব্দুল গফফার বলেন, “সীমিত জনবল এবং ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত রোগীর চাপ থাকার পরও আমরা সাধ্যমতো চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছি। জনবল সংকট দূরীকরণ এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি সচল করার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। বরাদ্দ এবং প্রয়োজনীয় লোকবল পেলেই দ্রুত এই সংকটগুলোর সমাধান সম্ভব হবে।”
তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘসূত্রতার কারণে হাসপাতালের ১০০ শয্যাকে ২৫০ শয্যায় রূপান্তরের আধুনিক ভবনটি দীর্ঘ ৮ বছরেও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। ভবনটি চার তলার ওপরে হওয়ায় লিফট ছাড়া রোগী স্থানান্তর অসম্ভব। গণপূর্ত বিভাগ লিফট জটিলতা সমাধান করে ভবনটি হস্তান্তর করলে এবং মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রশাসনিক অনুমোদন মিললে এটি চালু করা যাবে। আর ২৫০ শয্যা পূর্ণাঙ্গ চালু হলে নড়াইলের স্বাস্থ্য খাতের এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে।”
সাধারণ মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতালের শূন্য পদে চিকিৎসক নিয়োগ, লিফট জটিলতা নিরসন করে ২৫০ শয্যার নতুন ভবনটি চালু করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

