বাংলার ভোর প্রতিবেদক
১১ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে যশোর-১ (শার্শা) সংসদীয় আসন। আসনটিতে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন চার হেভিওয়েট নেতা। প্রাথমিকভাবে দলের মনোনয়ন পান বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি। মনোনয়ন পেয়েই তার অনুসারীদের নিয়ে নেমে পড়েন প্রচারণায়।
অন্যদিকে তৃপ্তির মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে রাজপথে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অটল থাকেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাসান জহির, সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটন ও সাবেক সভাপতি খায়রুজ্জামান মধুর অনুসারীরা। ক্ষোভ বিক্ষোভের পর তৃপ্তির মনোনয়ন পরিবর্তন করে আসনটিতে চূড়ান্ত প্রার্থী করা হয় নুরুজ্জামান লিটনকে।
এতে কার্যত ক্ষুব্ধ তৃপ্তির অনুসারীরা। প্রতীক বরাদ্দের পরেও ধানের শীষের পক্ষে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে না তৃপ্তি, জহির ও মধুর অনুসারীদের। ফলে নিজ অনুসারীদের নিয়ে গ্রাম কিংবা শহরে ছুটে বেড়াচ্ছেন ধানের শীষের প্রার্থী নুরুজ্জামান লিটন। তিনি বলেন, ‘দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। প্রতিক নিয়ে কাজ করছি।
অনেকের মধ্যে পাওয়া না পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। ঐক্যবদ্ধ না থাকলে বিরোধীরা তাদের শক্তি দেখাবে; এটাই স্বাভাবিক। তবে নেতাকর্মীরা ক্ষোভ দ্বিধাবিভক্তি ভুলে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করবে এমনটা প্রত্যাশা করছি। আসনটিতে মনোনয়ন বঞ্চিত তৃপ্তির মুঠোফোনে কয়েকদফা যোগাযোগ করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে আরেক বঞ্চিত নেতা হাসান জহির বলেন, ‘নেতাকর্মীদের ক্ষোভ আছে সত্যি। যার যার অনুসারীদের মাঝে হতাশা রয়েছে। তবে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারি না।’
নির্বাচন এগিয়ে এলেও যশোরে ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটি আসনে মেটেনি বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল। এ আসনগুলোতে মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থীদের অনুসারীদের এখনো মাঠে নামাতে পারেননি বিএনপির প্রার্থীরা। ভাঙাতে পারেননি মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থী কিংবা অনুসারীদের ক্ষোভ আর অভিমান।
জেলা বিএনপি’র পক্ষ থেকে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দিলেও স্থানীয় পর্যায়ের বড় অংশ তা মানছেন না। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। তৃণমূলের কর্মীরা বলছে, নেতাকর্মীদের দ্বিধা বিভক্তির এই দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দ্রুত কোন্দল মেটাতে না পারলে আসনগুলো হারানোর শঙ্কা রয়েছে বিএনপির।
এই বিষয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, ‘মনোনয়ন পাওয়া না পাওয়া নিয়ে বিভেদের সৃষ্টি হয়। সেই বিভেদ কাটাতে আমরা দলীয় প্রার্থীসহ বঞ্চিত নেতা ও তাদের কর্মীদের নিয়ে মতবিনিময় শুরু করেছি। আশা করছি, দ্রুতই সকল নেতাকর্মী ভেদাভেদ ভুলে দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে কাজ করবে। দলের বাইরে গেলে নেয়া হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা।’
যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন হাফ ডজন নেতা। এর মধ্যে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাবেরা সুলতানা। মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন চৌগাছা উপজেলার সাবেক সভাপতি জহিরুর ইসলাম। যদিও তিনি প্রতীক বরাদ্দের আগের রাতে সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর পাশাপাশি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দেন।
তারপরও প্রচারণার তিন দিন পার হলেও দলীয় প্রার্থীর সাথে দেখা যায়নি তাকে। আরেক মনোনয়ন বঞ্চিত মিজানুর রহমান খানকেও প্রচার প্রচারণাতে দেখা যায়নি। এই বিষয়ে সাবেরা সুলতানা বলেন, ‘যারা মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছে তাদেরকে এখনোও প্রচার প্রচারণাতে পাইনি। স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। ওনারা দ্রুতই আসবেন বলে আশা করছি।’
যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) মনোনয়ন পান কৃষকদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিএস আইয়ুব। তবে ঋণ খেলাপি হওয়ায় তার মনোনয়ন বাতিল করে কমিশন। পরবর্তীতে এই আসনে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে অভয়নগর বিএনপির সভাপতি মতিয়ার ফারাজীকে। গ্রুপিং বিভেদে বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে কাজ করছেন মতিয়ার। গ্রুপিং নিরসনে সম্প্রতি আসনটির দুই উপজেলার শীর্ষ নেতা ও বঞ্চিত প্রার্থীদের নিয়ে মতবিনিময় করে জেলা বিএনপি। মতবিনিময় হলেও এখনও মাঠে কাজ করতে দেখা যায়নি বঞ্চিত নেতা টিএস আইয়ুবের অনুসারীদের।
যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন পান উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহীদ মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন। পরে তাকে বাদ দিয়ে বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (একাংশ) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাসকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন শহীদ ইকবাল। বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়াতে ইতোমধ্যে ইকবালকে বহিস্কার করেছে দল। তার পরেও দলীয় একাংশের নেতাকর্মী নিয়ে মাঠে কাজ করছেন তিনি।
দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে দলের অপর অংশের নেতৃত্ব দেয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিন্টু কাজ করছেন। মিন্টু বলেন, ‘আসনটিতে নেতাকর্মীদের দ্বিধা বিভক্তি চরম। আমরা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছি। আসনটিতে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় সুবিধা নিচ্ছে জামায়াতের প্রার্থী। ফলে আমরা আসন হারানোর শঙ্কায় রয়েছি।’
যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন কেশবপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন আজাদ। এতে প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শেষ পর্যন্ত বাদ যান। আসনটিতে মনোনয়ন বঞ্চিত শ্রাবণ কিংবা আরেক মনোনয়ন বঞ্চিত বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপুর অনুসারীদেরকেও মাঠে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে না।
♦ ব্যতিক্রম শুধু সদর আসনে
ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটি আসনে দ্বিধাবিভক্তি থাকলেও ব্যতিক্রম শুধু সদর আসনে। এই আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। কেন্দ্রীয় নেতা হওয়াতে আসনটিতে অন্য কেউ মনোনয়ন চায়নি। ঐক্যবদ্ধ হয়ে জেলা উপজেলাসহ স্থানীয়নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সামাজিক অঙ্গনের প্রতিনিধিরাও অমিতের পক্ষে কাজ করছেন।
