বাংলার ভোর প্রতব্দেক :
যশোরের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থানগুলোকে সমন্বিত সড়ক যোগাযোগের আওতায় এনে ‘যশোর পর্যটন করিডর’ গড়ে তোলার প্রস্তাব যাচাইয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে সমীক্ষা প্রতিবেদন দিতে কমিটিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। পূজার ছুটির পর প্রতিমন্ত্রী ও যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের উপস্থিতিতে এ বিষয়ে পরামর্শসভা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যশোর পর্যটন করিডর’ প্রস্তাবের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে গত রোববার (১৮ অক্টোবর) জেলা সমন্বয় সভায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে। এ জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক (ডিডিএলজি) রফিকুল হাসানকে। কমিটি প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাই করে একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন দাখিল করবে।
এর আগে গত ১৭ অক্টোবর যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ‘যশোর পর্যটন করিডর’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উপস্থাপন করে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধুমঘাট’। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম প্রস্তাবটি তুলে ধরেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক রফিকুল হাসান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সুজন সরকার এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) খান মাসুম বিল্লাহসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এদিকে সোমবার দুপুরে ধুমঘাটের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের কাছে এ বিষয়ে একটি স্মারকলিপিও দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান স্মারকলিপিটি গ্রহণ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ধুমঘাটের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন, সহসভাপতি শাহেদ চৌধুরী ও সদস্য মো. নূরুন্নবী।
প্রস্তাবনায় যশোরের ঐতিহাসিক স্থাপনা, সাহিত্য-সংস্কৃতির স্মৃতিবিজড়িত স্থান, ফুলের ক্ষেত এবং বিল-বাওড়কে একটি সমন্বিত পর্যটন নেটওয়ার্কের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। এর লক্ষ্য, পরিকল্পিত যোগাযোগব্যবস্থা ও পর্যটকসেবা গড়ে তুলে যশোরকে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
প্রস্তাবিত পর্যটন করিডরে রয়েছে, ঝিকরগাছার গদখালী-পানিসারার ফুলের ক্ষেত, মণিরামপুরের রাজগঞ্জের ঝাপা বাওড়ের ভাসমান সেতু ও দমদম পীরের ঢিবি, কেশবপুরের মির্জানগরের হাম্মামখানা, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মস্থান সাগরদাঁড়ি, ভরত ভায়নার ভরতের দেউল, পাজিয়ায় ধীরাজ ভট্টাচার্যের বাড়ি, অভয়নগরের ১১ শিবমন্দির, মুড়ুলীর ঈমামবাড়া, চাচড়ার শিব মন্দির, যশোর কালেক্টরেট ভবন। যশোর শহরের আরো অন্য ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোও এ পরিকল্পনার আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবক মনিরুল ইসলাম বলেন, সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওর পর্যটনের মতো যশোরের বিল-বাওড়কেও স্বতন্ত্র পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এ জন্য বাওড়ভেদে ভিন্ন ভিন্ন পর্যটন কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা করা যেতে পারে। কোনো বাওড়ে পাখি দেখা, কোথাও নৌভ্রমণ, আবার কোথাও নিয়ন্ত্রিতভাবে ছিপ দিয়ে সৌখিন মাছ ধরার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পর্যটকেরা বাওড়পাড়ের মৎস্যজীবীদের জীবনযাপন কাছ থেকে দেখার পাশাপাশি মেঠোপথে হাঁটা ও গ্রামীণ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ পাবেন।
বাওড়পাড়ে স্থানীয় কৃষিপণ্য ও ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের বাজার গড়ে তোলার কথাও প্রস্তাবনায় রয়েছে। সেখানে যশোরের বিখ্যাত খেজুরের গুড়-পাটালি, কেশবপুরের কাঠশিল্প, শিমুলিয়ার খেজুরপাতা ও খড় দিয়ে তৈরি হস্তশিল্প এবং নকশিকাঁথার মতো পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হতে পারে। স্থানীয় খাবার, ছোট ক্যাফে, গেস্টহাউস ও পর্যটকসেবা কেন্দ্র গড়ে উঠলে গ্রামীণ অর্থনীতিও গতিশীল হতে পারে।
মনিরুল ইসলামের মতে, ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে সংযুক্ত করে পরিকল্পিত সড়ক যোগাযোগ ও পর্যটকসেবা গড়ে তোলা গেলে করিডরের দুই পাশে হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে এবং স্থানীয় পণ্যের দোকান গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে তরুণদের জন্য পরিবহন, পর্যটক গাইড, আতিথেয়তা, হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
প্রস্তাবনায় ‘একদিনে যশোর ভ্রমণ’ নামে একটি পর্যটন কর্মসূচি চালুর কথাও বলা হয়েছে। তবে সব দর্শনীয় স্থান এক দিনে ঘুরে দেখা সম্ভব কি না, তা যাচাই করে রুট নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রয়োজনে এক দিনের সংক্ষিপ্ত ভ্রমণের পাশাপাশি দুই ও তিন দিনের পর্যটন প্যাকেজ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবটির পরবর্তী ধাপে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অবস্থান, সড়কের অবস্থা, দূরত্ব, ভ্রমণকাল, দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকার এবং পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক, দিকনির্দেশক সাইনবোর্ড, বিশ্রামাগার, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার ও নিরাপদ পর্যটনসেবা গড়ে তোলার বিষয়গুলোও সমীক্ষায় গুরুত্ব পাবে বলে প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাবকের আশা, প্রশাসনিক যাচাই ও পরিকল্পিত বাস্তবায়নের মাধ্যমে যশোরের ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদকে কেন্দ্র করে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে স্থানীয় মানুষের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি তরুণদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সম্প্রসারিত হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সমীক্ষা, পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হবে।
মনিরুল ইসলাম আরো বলেন, ‘সমন্বিত পযটন করিডর প্রস্তবনার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সাথে কথা হয়েছে। তিনি এই প্রস্তবনা বাস্তবায়নে খুব আন্তরিক। তিনি বিষয় গুরুত্বের সাথে দেখার জন্য যশোরের জেলা প্রশাসককে বলেছেন। প্রতিমন্ত্রীর একান্ত আন্তরিকতায় অগ্রধিকার ভিত্তিতে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নে গতি পেয়েছে।’
