বাংলার ভোর প্রতিবেদক
ইটের সলিংয়ের গলির পথে দ্ইু যুবক মোটরসাইকেলে আসছেন। পাঁয়ে হেঁটে তাদের পিছু নিচ্ছে দুই যুবক। গলির পথ শেষ করেই বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে মোটরসাইকেল আরোহিরা। এরপর ছুরিকাঘাত করে মোটরসাইকেলের পিছনের ব্যক্তিকে। এর পর ছুরিকাঘাত ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায় পিছু নেয়া ওই দুই যুবক। ছুরিকাঘাত ও গুলি করে এই হত্যাকাণ্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সোমবার রাত ১২টার দিকে শহরের মুজিব সড়কের জয়তী সোসাইটির পেছনের একটি বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মীর সামিল সাকিব সাদী (৩৫) শহরের মুজিব সড়ক রেলগেট এলাকার মীর শওকত আলীর ছেলে। তার বিরুদ্ধে যশোর কোতোয়ালি থানায় একাধিক মামলা আছে।
পুলিশ জানায়, সাদী যুবলীগের শহর শাখার বহিস্কৃত নেতা ও ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ মেহবুব ম্যানসেলের সহযোগী ছিলেন। পাশাপাশি যুবলীগের সক্রিয় কর্মী ও ঠিকাদারি কাজও করতেন। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের সনাক্ত করতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারা বলছে, যে দুই যুবককে পালিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে তারা পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সুমন ওরফে ট্যাটু সুমন ও মেহেদী। তারাও ম্যানসেলের আরেক সহযোগী। সুমনের বিরুদ্ধে হত্যাসহ ১৪ টি ও মেহেদীর নামে হত্যাসহ ১২টি মামলা রয়েছে।
নিহতের চাচাতো ভাই রাকিব জানান, ‘রাত ১২টার দিকে তিনি ও সাদী মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন। বাড়ির সামনে পৌঁছালে পেছন থেকে সাদীকে চাকু দিয়ে আঘাত করা হয়। এরপর তাকে গুলি করে। এক রাউন্ড গুলির পর গুলি বের হচ্ছিল না। এ সময় তিনি হামলাকারী সুমন, মেহেদীসহ তাদের সহযোগীদের লক্ষ্য করে ইট নিক্ষেপ করলে তারা আরও ৫-৬ রাউন্ড গুলি ছুঁড়ে পালিয়ে যায়। তাদের ছোড়া দু’টি গুলি সাদীর গলা ও বুকে লাগে। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তিনি দাবি করেন, সাদী রেল বাজারের ইজারাদার। হামলাকারীরা বাজার এলাকায় চাঁদাবাজি করত। তাদের প্রশ্রয় না দেয়ায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাদীর নেতৃত্বে শহরের রেলগেট এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, হাটবাজার ইজারার নিয়ন্ত্রণ করতেন পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী মেহবুব ম্যানসেল। সামিলকে যারা হত্যা করেছেন, তারাও ম্যানসেলের সহযোগী। গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ম্যানসেল আত্মগোপনে চলে যান। ফলে রেলস্টেশন বাজার ও রেলগেট এলাকার চাঁদার টাকা তাকে দেয়া বন্ধ করেন সাদী। চাঁদার টাকা না পেয়ে ম্যানসেল তার অন্য সহযোগীদের দিয়ে সাদীকে হত্যা করিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুজিব সড়কের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, স্থানীয় মুজিব সড়কের ভিআইপি কাপড়ের মার্কেট, পাশের রেলবাজার কেন্দ্রিক আধিপত্য ও অর্থনৈতিক হিস্যা দ্বন্দ্বেই মূলত এই হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৪ সাল থেকে ম্যানসেলের নির্দেশে সাদী দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত দোকান থেকে চাঁদা তোলা হতো। ওই চাঁদার ভাগ বাটোয়ারা দ্বন্দ্বে এই হত্যাকাণ্ড বলে জানিয়েছে ব্যবসায়ীরা।
রেলগেট এলাকার একাধিক বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর যশোর শহরের কোর্ট মোড়ে হত্যার শিকার হন তৎকালীন জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি কবির হোসেন পলাশ। এতে সাদীর বিরুদ্ধে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।
হত্যাকাণ্ডের পর মোটরসাইকেলে পালানোর সময় শহরের পালবাড়ি ভাস্কর্য মোড়ে দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। এতে তার এক পা কেটে ফেলতে হয়। এক পা হারিয়েও আওয়ামী লীগের ক্ষমতার প্রভাবে এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন। আত্মগোপনে থাকা ম্যানসেলের অনেক সহযোগী সম্প্রতি এলাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সামিল খুন হতে পারেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নূর ই আলম সিদ্দিকী জানান, কারা ও কী কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, সেটি তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। সাদী সন্ত্রাসী, তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা আছে। এ ছাড়া হত্যাকারী হিসেবে যাদের নাম আসছে, তারাও সন্ত্রাসী। যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, তাদের গ্রেপ্তারে অভিযানে শুরু করেছে পুলিশ। মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই ঘটনায় মঙ্গলবার বিকেল চারটা পর্যন্ত মামলা হয়নি। তবে প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছে কোতয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি কাজী বাবুল হোসেন।