বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
শয্যা মাত্র ২৫০টি, অথচ প্রতিদিন ভর্তি থাকছেন ৯০০ থেকে এক হাজার রোগী। ফলে রোগীর চাপে কার্যত হাঁসফাঁস অবস্থা যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের। ওয়ার্ডে জায়গা না থাকায় বারান্দা, করিডর, সিঁড়ি—যেখানে সামান্য ফাঁকা জায়গা মিলছে, সেখানেই চলছে চিকিৎসা। অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতালের ভেতরে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তীব্র গরম। বারান্দা ও করিডরে থাকা অধিকাংশ রোগীর মাথার ওপর নেই কোনো ফ্যান। অনেক জায়গায় বাতাস চলাচলেরও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে গরমে ঘেমে একাকার হয়ে পড়ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।
রোববার সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, মেডিসিন, সার্জারি, শিশু ওয়ার্ডসহ প্রায় সব বিভাগেই শয্যার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি। প্রতিটি বেডের পাশে দুই থেকে তিনজন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। বেড না পেয়ে অনেকে মেঝেতে বিছানা পেতে শুয়ে আছেন। কেউ আবার করিডর কিংবা বারান্দায় অবস্থান করছেন। রোগীদের স্বজনরা হাতপাখা, কাগজ কিংবা কাপড় দিয়ে বাতাস করে স্বজনদের কিছুটা স্বস্তি দেয়ার চেষ্টা করছেন।
পুরুষ মেডিসিন বিভাগের বারান্দায় চিকিৎসাধীন জয়ন্ত বিশ্বাস বলেন, “তিন দিন ধরে এখানে আছি। বেড পাইনি। বারান্দাতেই থাকতে হচ্ছে। মাথার ওপর কোনো ফ্যান নেই। সারাদিন গরমে ছটফট করছি। রাতে আবার মশার যন্ত্রণাও সহ্য করতে হয়।”
একই বিভাগের রোগী জাহিদ হাসান বলেন, “চিকিৎসা করাতে এসে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে গরমে। এত মানুষ একসঙ্গে থাকায় দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। অসুস্থ শরীরে এই পরিবেশ সহ্য করা খুব কঠিন মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডের রোগী রোজিনা বলেন, “জ্বর নিয়ে ভর্তি হয়েছি। কিন্তু গরমে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছি না। ফ্যান না থাকায় সারাক্ষণ ঘামছি। অসুস্থ শরীরে এই কষ্ট আরও বেশি।”
রোগীদের পাশাপাশি সীমিত জনবল নিয়ে অতিরিক্ত রোগীর সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরাও। মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডের নার্স রেবেকা খাতুন বলেন, আমার ওয়ার্ডে মাত্র তিনজন নার্স। এই তিনজন মিলে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৫০ জন রোগীকে সেবা দিতে হয়। এত রোগীর চাপ সামলানোই কঠিন, তার ওপর প্রচণ্ড গরমে কাজ করতে আরও কষ্ট হয়।
শিশু ওয়ার্ডের চিকিৎসক ডা. আফসার আলী বলেন, শুধু শিশু ওয়ার্ড নয়, প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডেই একই অবস্থা। বারান্দা, করিডর, সিঁড়ি-যেখানে একটু জায়গা পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। রোগীর তুলনায় চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা অনেক কম। আবার একই সঙ্গে বহির্বিভাগের রোগীদেরও সেবা দিতে হয়।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, বর্ষা মৌসুমে ডায়রিয়া, জ্বর, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। কিন্তু শয্যা ও জনবল না বাড়ায় সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। রোগী ও তাদের স্বজনদের দাবি, অন্তত বারান্দা ও করিডরে অতিরিক্ত ফ্যান স্থাপন, বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত এবং রোগীর চাপ কমাতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। তাদের ভাষায়, “অসুস্থতার কষ্ট একদিকে, আর গরমের কষ্ট আরেকদিকে।
হাসপাতালে এসে যেন দ্বিগুণ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।”
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. হুসাইন শাফায়াত বলেন, “২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন ৯০০ থেকে এক হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। এত রোগীর চাপ সামাল দেয়া অত্যন্ত কঠিন। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবহাওয়াগত কারণে রোগীর চাপ বেড়ে যায়। গরমই এখানে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। শীতকালে রোগীর সংখ্যা অনেক কমে যায়।”

