স্বাধীন মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ
যশোর সদর হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডের সেবিকা কক্ষে বসে আছেন ল্যাব এইড হাসপাতালের মার্কেটিং অফিসার মো. সাইফুল্লাহ। ওই ওয়ার্ডের প্যাথলজি রোগী নূর ইসলামকে ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিলে সেবিকা শারমিন আক্তার নূর ইসলামের স্বজনকে বলেন, ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেন।
সাইফুল্লাহ রোগীর কাপড়চোপড় দেখে বলেন, ল্যাব এইডে চলে যান। পরে রোগীর স্বজনরা জানতে পারেন, এটি ল্যাব এইড প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ বেশি।
পুরো ঘটনাটি নজরে আসে বাংলার ভোরের এই প্রতিনিধির। সাইফুল্লাহ’র কাছে তার পরিচয় জানতে চাওয়া হলে তিনি তার চাকরির কথা স্বীকার করেন। পরে যখন বলা হয়, আপনি কি কোনো রোগীকে হাসপাতালের ভেতরে বসে অন্য প্রাইভেট ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাওয়ার কথা বলতে পারেন?
সাইফুল্লাহ বলেন, না পারি না। সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে সাইফুল্লাহ দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করেন এবং এই প্রতিবেদককে তাদের প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার কথা বলেন।
শুধু ল্যাবএইড’র সাইফুল্লাহ নয়, যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে এমন অর্ধশত দালাল প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। যাদের মধ্যে রয়েছে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আস্থা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কিংস মেডিকেল, স্ক্যান হাসপাতাল, কমটেক ডায়াগনস্টিক, লাইফকেয়ার ডায়াগনস্টিক, ডক্টরস ল্যাব এণ্ড কনসালটেশন সেন্টার, দেশ ক্লিনিকসহ অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান।
এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকৃত ব্যক্তিদের কেউ নিজেকে সাংবাদিক, কেউবা রাজনৈতিক নেতার ভাই, কেউবা রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থক আবার কেউবা স্থানীয় সন্ত্রাসীর নাম পরিচয় দিয়ে হাসপাতালে অবস্থান ও রোগী ভাগানোর কাজ করে থাকে। এই চক্রটি সুকৌশলে রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার কাজ করে। প্রথম দেখায় এই চক্রের সদস্যদের সরকারি হাসপাতালের কোনো ডাক্তার বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি মনে হয়। পোশাক, ব্যবহার ও প্রভাব-সব মিলিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা প্রথমে বুঝতে পারেন না তারা হাসপাতালের কেউ নন।
হাসপাতালের গেট, টিকিট কাউন্টার, ওয়ার্ড, ল্যাব-সব জায়গায় অনায়াসে যাতায়াত করতে পারে এ চক্রের সদস্যরা। অভিযোগ রয়েছে, যশোর জেনারেল হাসপাতালের নার্স, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ও স্বেচ্ছাসেবকরা মুনাফার লোভে আবার কখনো ভয়ে এই চক্রের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করে। তাদের এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা সাধারণ মানুষ চিকিৎসা সেবা নিতে এসে প্রতারণার শিকার হন প্রতিনিয়ত।
ঝিকরগাছা থেকে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা আলাউদ্দীন খান নামে রোগীর এক স্বজন বলেন, যশোর হাসপাতালে এসে গোলকধাঁধায় পড়তে হচ্ছে। যারা নতুন আসে তাদের বেশি সমস্যা। এখানে কে দালাল আর কে সরকারি লোক-চেনা যায় না। সরকারি হাসপাতালে এসেও বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বলে।
আছিয়া খাতুন নামে রোগীর এক স্বজন বলেন, আমার আত্মীয়ের পক্স হয়েছে। হাসপাতালে নাকি পরীক্ষা করা যায় না, বাইরে পরীক্ষা করতে যেতে বলছে।
এ বিষয়ে যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হুসাইন সাফায়েতের মুঠো ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ফোন রিসিভি না করায় কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

