বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
চলতি বছরের প্রথম সাড়ে পাঁচ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে খুলনা বিভাগে।

বিভাগটিতে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধে ১১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা দেশের অন্য যেকোনো বিভাগের তুলনায় সর্বোচ্চ।

নিহতদের বড় অংশই বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। তবে দেশজুড়ে ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিভিন্ন ঘটনায় মোট ৫৯ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম সাড়ে পাঁচ মাসে সারাদেশে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, নির্বাচন-পরবর্তী সংঘাত ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে ৫৯ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির ৪৫ জন, জামায়াতের সাতজন এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাতজন রয়েছেন।

রাজনৈতিক বিরোধে সংঘটিত ৩০টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সর্বাধিক ১১টি ঘটেছে খুলনা বিভাগে। এরপর রয়েছে রাজশাহী বিভাগ, যেখানে আটজন নিহত হয়েছেন। ঢাকা বিভাগে পাঁচ, ময়মনসিংহে তিন এবং চট্টগ্রাম, সিলেট ও রংপুর বিভাগে একজন করে নিহত হন।

খুলনা বিভাগের আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে বাগেরহাটের ফকিরহাটে কৃষক দলের ইউনিয়ন সভাপতি বাদল মোড়লকে কুপিয়ে হত্যা।

গত ৯ জুন রাতে সংঘটিত এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের বিরোধ কাজ করেছে বলে প্রাথমিকভাবে তদন্তে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে ঢাকা ও যশোরের অভয়নগর থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

এ ছাড়া খুলনা বিভাগের চুয়াডাঙ্গা জেলায় রাজনৈতিক সহিংসতায় একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। জীবননগরে সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে জামায়াতের হাফিজুর রহমান ও ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মফিজুর রহমান নিহত হন। একই জেলার আলমডাঙ্গায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন শিমুল কাজী। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, খাসজমির নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই ওই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিভিন্ন দলের মধ্যে সংঘর্ষে ৩০ জন নিহত হয়েছেন।

তাদের মধ্যে ২৩ জনই বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত হয়েছেন ১৪ জন। বিএনপি-জামায়াত বিরোধে নিহত হয়েছেন ১১ জন এবং বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন পাঁচজন।

অন্যদিকে রাজনৈতিক সংঘাতের বাইরে বিভিন্ন ঘটনায় আরও ২৯ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে বিএনপির ২২ জন, আওয়ামী লীগের পাঁচজন এবং জামায়াতের দুজন।

এসব হত্যার অন্তত ১৩টির ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, চাঁদা না দেয়া, জমি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক বিরোধ, ওয়াজ-মাহফিলের টাকার হিসাব ও ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি ১৬টি হত্যার কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আসকের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত রাজনৈতিক সংঘাতের ৩৪৭টি ঘটনায় আহত হয়েছেন দুই হাজার ৬৩৬ জন নেতাকর্মী। এর মধ্যে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে আহত হয়েছেন সর্বাধিক ৯৮০ জন এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৭৪৫ জন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, একই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বার্থ, পদ-পদবি, আধিপত্য ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ না হলে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড কমানো সম্ভব হবে না।

পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, তদন্তে দেখা যায়, রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিদের সব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক কারণ থাকে না। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত বিরোধ, জমি কিংবা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব মূল কারণ হিসেবে উঠে আসে। তবে রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।

Share.
Exit mobile version