হিমেল খান :
একদিনের সিদ্ধান্তে থেমে গেছে ভারতীয় ইলিশের আমদানি। যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে ইলিশ আমদানির ১০৩টি অনাপত্তি সনদ বাতিল করেছে মৎস্য অধিদপ্তর।
এ অবস্থায় মঙ্গলবার থেকে বন্ধ রয়েছে আমদানি। এতে একদিকে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ার কথা বলছেন আমদানিকারকেরা। অন্যদিকে, ভারতীয় ইলিশের আমদানি বন্ধ হওয়ায় দেশি ইলিশ বিক্রির সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
বুধবার বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের পরিদর্শক আশওয়াদুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় ও মৎস্য অধিদপ্তর থেকে চিঠি পাওয়ার পর মঙ্গলবার থেকে ভারতীয় ইলিশ আমদানি বন্ধ করা হয়েছে। সোমবারের পরে বেনাপোল বন্দর দিয়ে আর কোনো ইলিশ প্রবেশ করেনি।
চলতি বছরের জুলাই, অগাস্ট ও সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখ পর্যন্ত এই স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে ৫৫৩ টন ইলিশ এসেছে, যার এলসি মূল্য নয় লাখ ১০ হাজার ডলার। মৎস অধিদপ্তর ১০৩ টি অনাপত্তি সনদ বাতিল করায় আমদানি বন্ধ রয়েছে বলেও জানান আশওয়াদুল আলম।
ফিশারিজ পরিদর্শক আশওয়াদুল আলম বলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. খালেদ কনকের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে মঙ্গলবার ১০৩টি অনাপত্তি সনদ বাতিল করা হয়। এরপর থেকেই ভারত থেকে ইলিশ আমদানির প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে। তবে হঠাৎ আমদানি বন্ধের নির্দিষ্ট কারণ চিঠিতে জানানো হয়নি বলে জানান তিনি।
মৎস অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ভারত থেকে এক হাজার ৭৩৯ দশমিক ৫০ টন ইলিশ আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে মঙ্গলবার পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে এসেছে ৫৫৩ টন ইলিশ। এসব ইলিশের এলসি মূল্য ৯ লাখ ১০ হাজার ডলার।
ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের কর্মকর্তা সজীব সাহা জানান, বছরের প্রথম দুই মাসে আমদানি করা ইলিশের ঘোষিত মূল্য ছিল ৬ কোটি ৯২ লাখ ৯৪ হাজার ৫১০ টাকা। জুলাইয়ে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি ইলিশের আমদানি মূল্য ছিল ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯৬ টাকা। আর অগাস্টে তিন লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি মাছের ঘোষিত মূল্য দাঁড়ায় ছয় কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪ টাকা।
জুলাই ও অগাস্টে মোট ২০টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে ইলিশ এনেছে। জুলাইয়ে তিনটি এবং অগাস্টে ২০টি প্রতিষ্ঠান ইলিশ আমদানি করে।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, ইলিশ আমদানির জন্য ব্যবসায়ীরা সরকারি অনুমোদনের ওপর ভিত্তি করেই প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ভারতীয় অংশে মাছ কেনা, পরিবহণ ও অন্যান্য প্রক্রিয়ায় অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে।
এখন হঠাৎ করে অনাপত্তি সনদ বাতিল হওয়ায় আমদানিকারকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তিনি বলেন, ভারতীয় অংশে যারা ইলিশ কেনার প্রস্তুতি নিয়েছেন বা ইতোমধ্যে মাছ কিনেছেন, আমদানি বন্ধ থাকায় তাদের পণ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা না হলে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে।
ইলিশ আমদানিকারক রাব্বি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জিসান আহমেদ রাব্বি বলেন, অনুমোদন পাওয়ার পর ভারতীয় বাজারে ইলিশ কেনার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল।
অনেক আমদানিকারক ইতোমধ্যে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। হঠাৎ করে আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই বিনিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ভারতীয় বাজারে কেনা ইলিশ সময়মতো বাংলাদেশে আনা না গেলে কম দামে ফেরত দিতে হতে পারে।
অপর এক আমদানিকারক সৈয়দ মহিদুল হক রুবাই বলেন, আমদানির উদ্দেশে ভারতের ওপারে ইলিশ কিনে রাখা হয়েছিল সেগুলো ফেরত দিতে হবে। এতে মাছের ক্রয়মূল্যের পাশাপাশি পরিবহণসহ আমদানি প্রক্রিয়ায় হওয়া অন্যান্য খরচও লোকসানে পরিণত হবে।
এদিকে ভারতীয় ও মিয়ানমারের ইলিশকে দেশি বা পদ্মার ইলিশ হিসেবে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে ভোক্তাদের। ভোক্তা ও ক্রেতা সাধারণ বলছেন, আমদানি করা ভারতীয় ও মিয়ানমারের ইলিশকে দেশি বা পদ্মার ইলিশ হিসেবে বিক্রি করে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।
ক্রেতা মারুফ কবীর জানান, আমদানি করা ভারতীয় ইলিশ দেখতে অনেকটা পদ্মার ইলিশের মতো হওয়ায় তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। ফলে অনেকেই বুঝতে পারে নি যে এটি দেশি ইলিশ নাকি ভারতীয়।
মিলন রহমান নামের আরেক ক্রেতা জানান, স্বাদে পার্থক্য থাকলেও বাহ্যিকভাবে মিল থাকায় দেশি ইলিশ ভেবে ভারতীয় ইলিশ কিনছেন তিনি। তবে এখন ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধ থাকায় দেশি ইলিশ কিনতে পারবেন তারা।
দেশি ইলিশের ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন বলেন, ভারতীয় ইলিশের আমদানি বন্ধ থাকায় এবার তারা দেশি ইলিশ বিক্রির সুযোগ পাবেন। এতে ক্রেতারাও দেশি ইলিশ কেনার সুযোগ পাবেন বলে তিনি মনে করেন।
আমদানিকারকরা বলছেন, ১০৩টি অনাপত্তি সনদ বাতিলের পর অবশিষ্ট অনুমোদনের আওতায় ভারত থেকে ইলিশ আমদানি হবে কি না, সেটিও এখন অনিশ্চিত। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
বেনাপোল স্থলবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রুহুল আমিন বলেন, বুধবার সকাল থেকে কোনো ভারতীয় ইলিশ বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করেনি। মৎস্য অধিদপ্তর থেকে আমদানিকারকদের অনাপত্তি বাতিল করায় কেউ আমদানি করতে পারেনি বলে শুনেছেন তিনি।
