আব্দুল কাদের :
বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের স্মৃতি ধর্মীয় বিশ্বাস, জনকল্যাণ ও স্থাপত্যকীর্তির সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে। তাঁদের অন্যতম হযরত খানজাহান আলী (রহ.)। বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ, খানজাহান আলীর সমাধিসৌধ, অসংখ্য দিঘি, সড়ক ও জনবসতির সঙ্গে তাঁর নাম আজও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। পনেরো শতকের প্রথমার্ধে তিনি বর্তমান বাগেরহাট, খুলনা ও বৃহত্তর যশোরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রভাবশালী শাসক ও সুফিসাধক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁর উপাধি ছিল ‘উলুঘ খান’ ও ‘খান-ই-আযম’। ইতিহাসে তিনি খানজাহান আলী নামে অধিক পরিচিত।
জন্ম ও প্রাথমিক জীবন
খানজাহান আলীর জন্মসন ও জন্মস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক দলিল খুবই সীমিত। পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন গ্রন্থ ও লোককথায় তাঁর বংশপরিচয় ও শৈশব সম্পর্কে নানা বিবরণ পাওয়া যায়। ফলে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিবেদনে এসব তথ্যকে নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে না লিখে ‘প্রচলিত বর্ণনা’ হিসেবে উল্লেখ করাই অধিক গ্রহণযোগ্য। তাঁর শিক্ষাজীবন সম্পর্কেও বিভিন্ন লোকমুখে নানা কাহিনি রয়েছে। তবে ঐতিহাসিকভাবে যে বিষয়টি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট, তা হলো-তিনি দিল্লির তুঘলক শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একজন আমির বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর পরবর্তী স্থাপত্যে দিল্লির তুঘলক স্থাপত্যরীতির প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়।
দিল্লি থেকে বাংলায় আগমন
খানজাহান আলী ঠিক কোন সালে এবং কোন পথ ধরে বাংলায় এসেছিলেন-এ বিষয়ে নিশ্চিত তারিখ পাওয়া যায় না। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৩৯৮ সালে তৈমুরের দিল্লি আক্রমণের পরপরই তিনি বাংলায় এসে থাকতে পারেন। অর্থাৎ তাঁর বাংলায় আগমনের সময়কাল চতুর্দশ শতকের শেষভাগ বা পঞ্চদশ শতকের সূচনাপর্ব বলে ধারণা করা হয়। বাংলায় এসে তিনি প্রথমে সুন্দরবন সংলগ্ন বিশাল বনাঞ্চলের দায়িত্ব ও জমি জাগির হিসেবে লাভ করেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তখন দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিল ঘন বন, জলাভূমি ও নদীনির্ভর দুর্গম ভূখণ্ড। খানজাহান আলী সেখানে বসতি স্থাপন, কৃষি সম্প্রসারণ ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
বনভূমি থেকে জনপদ
খানজাহান আলীর সবচেয়ে বড় অবদান শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি একটি দুর্গম বনাঞ্চলকে পরিকল্পিত জনপদে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
তাঁর অধীনস্থ বুরহান খান ও ফতেহ খানসহ সহযোগীদের মাধ্যমে কপোতাক্ষ নদের পূর্ব তীরবর্তী অঞ্চল ও মসজিদকুড় এলাকার বন পরিস্কার করে বসতি গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে নেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তৃত হয় বৃহত্তর যশোর ও খুলনার বিস্তীর্ণ এলাকায়। এই জনপদ নির্মাণের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে খলিফাতাবাদ, যার অবস্থান বর্তমান বাগেরহাট শহর ও আশপাশের এলাকায়। ইউনেস্কো ঐতিহাসিক মসজিদ নগরী বাগেরহাটকে পঞ্চদশ শতকের একটি অসাধারণ মধ্যযুগীয় নগর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
খলিফাতাবাদ-এক পরিকল্পিত নগর
খানজাহান আলীর প্রতিষ্ঠিত খলিফাতাবাদ ছিল শুধু একটি ধর্মীয় কেন্দ্র নয়; এটি ছিল পরিকল্পিত নগর। এখানে মসজিদ, রাস্তা, সেতু, জলাধার, দিঘি, সমাধিসৌধসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মিত হয়েছিল। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ঐতিহাসিক মসজিদ নগরীটি প্রায় ৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত ছিল এবং এখানে বিপুলসংখ্যক মসজিদ, জনকল্যাণমূলক স্থাপনা, সড়ক, সেতু, জলাধার ও সমাধি নির্মিত হয়েছিল। বাগেরহাট ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
ষাটগম্বুজ মসজিদ-স্থাপত্যের বিস্ময়
খানজাহান আলীর নাম উচ্চারিত হলেই প্রথমে যে স্থাপত্যকীর্তির কথা মনে পড়ে, সেটি হলো বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ।
নাম ‘ষাটগম্বুজ’ হলেও প্রত্নতাত্ত্বিক হিসাবে মসজিদটির ছাদে মোট ৮১টি গম্বুজ রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মসজিদটির বাইরের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬০ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ১০৪ ফুট; দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় সাড়ে ৮ ফুট।
ইউনেস্কো ষাটগম্বুজ মসজিদকে বাংলার প্রাথমিক মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করেছে। পুরো বাগেরহাট ঐতিহাসিক মসজিদ নগরীর স্থাপত্যে যে স্বাতন্ত্র্য তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে খানজাহানের নাম গভীরভাবে যুক্ত।
মসজিদ, মাদ্রাসা, সড়ক ও দিঘি
খানজাহান আলীর কর্মযজ্ঞ ছিল বহুমুখী। তিনি মসজিদ নির্মাণের পাশাপাশি মাদ্রাসা, সরাইখানা, সড়ক, সেতু ও অসংখ্য দিঘি খনন করেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ জনপদের মধ্যে মারুলি কসবা, পৈগ্রাম কসবা ও বড়বাজারের নাম পাওয়া যায়। বাগেরহাটের সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলের যোগাযোগ স্থাপনের জন্য সড়ক নির্মাণের কথাও ইতিহাসে উল্লেখ আছে।
খানজাহানের খনন করা দিঘিগুলোর মধ্যে খাঞ্জালি (খানজাহান আলী) দিঘি এবং ঘোড়াদিঘি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব জলাধার শুধু ধর্মীয় বা সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ছিল না; তৎকালীন জনপদের পানীয় জল ও দৈনন্দিন জীবনেও এগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে ধারণা করা যায়।
তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন
খানজাহান আলীকে স্থানীয় মুসলিম সমাজে একজন মহান সুফিসাধক ও ওলী হিসেবে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তাঁর জীবনের সঙ্গে ধর্মপ্রচার, জনকল্যাণ ও মানবসেবার নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তবে তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বহু কাহিনি পরবর্তী সময়ে লোকমুখে প্রচলিত হয়েছে। যেমন অলৌকিক ক্ষমতা, বন্যপ্রাণী বশ করা বা বিভিন্ন কারামতের গল্প। এসবের ধর্মীয় ও লোকবিশ্বাসগত মূল্য থাকলেও জাতীয় পত্রিকার ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে এগুলোকে প্রামাণ্য ইতিহাসের পরিবর্তে ‘জনশ্রুতি’ হিসেবে উল্লেখ করাই উচিত।
প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত বিষয় হলো-তাঁর নির্মিত বিপুলসংখ্যক ধর্মীয় স্থাপনা এবং তাঁর সমাধির শিলালিপি তাঁর ধর্মীয় নিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে। ইউনেস্কোও বাগেরহাটের বিপুল ধর্মীয় স্থাপনার ঘনত্বকে খানজাহানের ধর্মপরায়ণতার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
খানজাহানের মৃত্যু
ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নিশ্চিত তথ্যগুলোর একটি হলো তাঁর মৃত্যুর তারিখ।
খানজাহান আলী ৮৬৩ হিজরির ২৭ জিলহজ, ২৫ অক্টোবর ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। তাঁর নিজের নির্মিত সমাধিসৌধেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। সমাধিসৌধের শিলালিপি থেকেও তাঁর মৃত্যুর তারিখ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।
আজও বাগেরহাটে তাঁর মাজারে অসংখ্য মানুষ জিয়ারত করতে যান। তাঁর দরগাহকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে।
ইতিহাসের পাতায় খানজাহান আলীর মূল্যায়ন
খানজাহান আলীকে শুধু একজন সুফিসাধক হিসেবে দেখলে তাঁর ঐতিহাসিক অবদান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে শাসক, নগর-পরিকল্পনাকারী, নির্মাতা, জনপদ প্রতিষ্ঠাতা এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব।
তাঁর হাতে গড়ে ওঠা খলিফাতাবাদ পরবর্তীকালে বাগেরহাটের ঐতিহাসিক পরিচয়ের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। ইটের তৈরি মসজিদ, দিঘি, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য স্থাপনা আজও তাঁর সময়ের উন্নত নির্মাণ ও নগর পরিকল্পনার সাক্ষ্য বহন করছে। ইউনেস্কো বাগেরহাটকে মধ্যযুগীয় মুসলিম নগরসভ্যতার একটি অসাধারণ নিদর্শন হিসেবে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়েছে।
শেষকথা। প্রায় ছয় শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও খানজাহান আলীর স্মৃতি দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার মানুষের কাছে অমলিন। সুন্দরবনঘেঁষা দুর্গম অরণ্যভূমিকে জনপদে রূপ দেয়া, ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ, পানির ব্যবস্থা করা, যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং খলিফাতাবাদের মতো একটি নগর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি যে ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, তা আজও দৃশ্যমান।
তাঁর জীবনের বহু অধ্যায় নিয়ে লোককথা ও কিংবদন্তি থাকলেও ইতিহাসের সবচেয়ে দৃঢ় সাক্ষ্য তাঁর নির্মিত স্থাপত্য ও সমাধির শিলালিপি। তাই হযরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর জীবনকে একদিকে আধ্যাত্মিক সাধনার ঐতিহ্য, অন্যদিকে মধ্যযুগীয় দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার নগরায়ণ ও স্থাপত্যের ইতিহাস-দুই দৃষ্টিকোণ থেকেই মূল্যায়ন করা যায়।

