শরিফুল ইসলাম :
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে যশোর জেলায় ৯৭টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। জেলা পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। গত বছরের একই সময়ে জেলায় হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছিল ৯৯টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে হত্যাকাণ্ডের মামলা কমেছে দুটি।
তবে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা সামান্য কমলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। বিশেষ করে বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে হামলা, পূর্ববিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ড, পারিবারিক কলহ, জমিজমা ও অর্থনৈতিক বিরোধ এবং অপরাধীচক্রের সংঘাতকে কেন্দ্র করে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। কোনো কোনো ঘটনায় হত্যার পর মরদেহ গুম বা ঘটনাস্থল পরিবর্তনের চেষ্টার অভিযোগও সামনে এসেছে।
জেলা পুলিশের পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে সংঘটিত ৯৭টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ২০টির কারণ এখনো জানা যায়নি। এসব ঘটনায় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ঘটনার পেছনের অন্যান্য তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মোট মামলাও বেড়েছে
হত্যাকাণ্ডের মামলা কিছুটা কমলেও যশোরে সার্বিকভাবে মামলার সংখ্যা বেড়েছে। জেলা পুলিশের সামগ্রিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত জেলায় বিভিন্ন অপরাধে মোট ৩ হাজার ৩৯৯টি মামলা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে মোট মামলার সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ১১৭টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মোট মামলা বেড়েছে ২৮২টি।
পুলিশের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অপরাধের ধরন অনুযায়ী মামলার সংখ্যায় ওঠানামা রয়েছে। খুন, ডাকাতি, দস্যুতা ও অপহরণের মামলা কিছুটা কমলেও চুরি, মাদকদ্রব্য এবং চোরাচালানসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা বেড়েছে। এতে জেলার সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি মরদেহ উদ্ধার
এদিকে বছরের বিভিন্ন সময়ে যশোর জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা বা অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।
তবে মরদেহ উদ্ধার এবং হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা এক বিষয় নয়। কোনো ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার হলেই সেটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে গণনা করা যায় না। ময়নাতদন্ত, তদন্ত এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে আত্মহত্যা, সড়ক বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা, অসুস্থতাজনিত মৃত্যু কিংবা মৃত্যুর কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি—এমন ঘটনাও থাকতে পারে।
এ কারণে লাশ উদ্ধারের সংখ্যা ও হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা একসঙ্গে যোগ করে জেলার মোট ‘মৃত্যু’ বা ‘খুন’ হিসেবে উপস্থাপন করলে পরিসংখ্যানগতভাবে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
বিভিন্ন ঘটনায় তদন্ত অব্যাহত
যশোরে বিভিন্ন সময়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন, আলামত সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তদন্ত শুরু করে। কোনো কোনো ঘটনায় দ্রুত আসামি গ্রেপ্তার হলেও কিছু ঘটনা দীর্ঘ সময় তদন্তাধীন থাকে।
সম্প্রতি যশোর শহরের লিচুতলা এলাকায় ছুরিকাঘাতে এক যুবক নিহত হওয়ার ঘটনায় পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে তদন্ত শুরু করে। এ ধরনের ঘটনাগুলোতে হত্যার কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পুলিশ তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনায় প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার জন্য তদন্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি চালানো হচ্ছে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়ানোর দাবি
সচেতন নাগরিকদের মতে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা কারণগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। শুধু ঘটনার পর আসামি গ্রেপ্তার নয়, কেন এসব অপরাধ ঘটছে—সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পারিবারিক বিরোধ, মাদক, পূর্বশত্রুতা, অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব, জমিজমা নিয়ে বিরোধসহ যেসব কারণে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে প্রাণহানি কমানো সম্ভব হতে পারে।
একই সঙ্গে অপরাধের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া এবং বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে যশোরে ৯৭টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি হত্যাকাণ্ডের কারণ এখনো অজানা বলে পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে জেলায় সব ধরনের অপরাধ মিলিয়ে হয়েছে ৩ হাজার ৩৯৯টি মামলা। ফলে হত্যাকাণ্ড কিছুটা কমলেও সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি অপরাধের কারণ চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
