বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
একটি হোটেলের আগুন কেড়ে নিয়েছে একই পরিবারের চারজনকে। পুড়ে যাওয়া সেই হোটেল থেকে ময়নাতদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেসে শনিবার কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরেছেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শারমিন, তিন বছরের সন্তান স্বর্ণশীষ দত্ত ও শ্বশুর আকরাম আলী। তাদের সঙ্গে দেশে ফিরেছেন আরও দুই বাংলাদেশির মরদেহ।
কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পাঁচ দিন পর শনিবার বেনাপোল ও ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে দেশে ফিরল ছয় বাংলাদেশির মরদেহ। মরদেহ পৌঁছানোর পর সীমান্তে স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ।
শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কলকাতার বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে তিনটি অ্যাম্বুলেন্সে করে পাঁচ বাংলাদেশির মরদেহ পেট্রাপোল সীমান্তে নিয়ে আনা হয়। পরে বিজিবি ও বিএসএফের উপস্থিতিতে বিকেল ৫টার দিকে বেনাপোল সীমান্তের শূন্যরেখায় মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। প্রয়োজনীয় ইমিগ্রেশন ও আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে কফিনগুলো কুষ্টিয়া ও ঢাকার উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়।
এর আগে শুক্রবার রাতে মরদেহগুলো দেশে ফেরার কথা থাকলেও প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রের জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি।
নিহতদের মধ্যে কুষ্টিয়ার একই পরিবারের চারজন হলে, কুষ্টিয়া শহরের আরুয়াপাড়া মোহিনী মিল এলাকার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৩৯), তার স্ত্রী আফসানা শারমিন (২৭), সন্তান স্বর্ণশীষ দত্ত (৩) এবং আফসানার বাবা আকরাম আলী (৬৪)।
নিহত অপর বাংলাদেশি ঢাকার সাভারের আমিনবাজার এলাকার কসমেটিকস ব্যবসায়ী জোবায়ের বাবু আহমেদ (৩৭)। তিনি ব্যবসায়িক কাজে কলকাতায় গিয়ে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। পরে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তার মৃত্যুর বিষযটি নিশ্চিত করা হয়।
গত ১৯ আগস্ট ভোরে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটে ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নয়জনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি নাগরিক। নিহতদের একজন সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার এস এম আলিমুজ্জামান সাজুর মরদেহ শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে দেশে আসে।
পরে আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আসরের নামাজের পর জানাজা শেষে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তিনি স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন।
নিহত আরেক বাংলাদেশি সাতক্ষীরার রেবতী সরকারের মরদেহ দেশে আনা হয়নি। পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কলকাতার নিমতলা মহাশ্মশানে তার সৎকার সম্পন্ন হয়েছে।
কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী, সন্তান ও শ্বশুরের মরদেহ গ্রহণ করেন কুষ্টিয়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আল-মামুন সাগর ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনিসুজ্জামান। এ সময় আল-মামুন সাগর নিহতদের পরিবারের জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের সরকারের কাছে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তার দাবি জানান।
তিনি বলেন, এই দুর্ঘটনায় পরিবারগুলো অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছে। সরকারকে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
দেবাশীষ দত্ত দৈনিক ‘আজকের পত্রিকা’ ও বেসরকারি টেলিভিশন ‘চ্যানেল ৯’-এর কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় ‘আজকের আলো’ পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্ত্রী আফসানা শারমিন অসুস্থ থাকায় পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন। সেখানে ‘শিখা ইন’ হোটেলে অবস্থানকালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কেড়ে নেয় পুরো পরিবারকে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দেবাশীষ দত্ত ও তার ছেলে স্বর্ণশীষ দত্তকে সমাহিত করা হবে। অন্যদিকে আফসানা শারমিন ও তার বাবা আকরাম আলীকে ইসলামী রীতিতে দাফন করা হবে।
এদিকে মর্মান্তিক এ ঘটনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করেছে।
মরদেহ শনাক্ত করতে গিয়ে নিহতদের স্বজনদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিহতের স্বজনরা। নিহত সাজুর ছোট ভাই মনিরুজ্জামান বলেন, মরদেহের অবস্থা এতটাই বিকৃত ছিল যে শনাক্ত করতেও অনেক কষ্ট হয়েছে। ফুলে যাওয়া শরীর, বিভিন্ন জায়গায় মাংস না থাকা ও চামড়া উঠে যাওয়ার দৃশ্য ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।
অপর এক স্বজন ‘শিখা ইন’ হোটেলের ভয়াবহ অবস্থা তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনি সেখানে যে পরিস্থিতি দেখেছেন, সেটিকে হোটেল বলার মতো নয়, বরং কবরস্থানের মতো মনে হয়েছে।
এর আগে শনিবার দুপুরে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী গাড়িতে করে কফিনগুলো বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের সামনে নেয়া হয়। সেখানে নিহতদের স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন। ময়নাতদন্তসহ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
বেনাপোল স্থলবন্দরের উপপরিচালক (ট্রাফিক) রুহুল আমিন ও বেনাপোল ইমিগ্রেশন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফেরদৌস হোসেন খান মরদেহ দেশে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বেনাপোল ইমিগ্রেশন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফেরদৌস হোসেন খান বলেন, বিকেলে মরদেহগুলো বেনাপোল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নিহতদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মরদেহগুলো দেশে ফেরার পর স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিজ নিজ এলাকায় নিয়ে মরদেহ দাফনের প্রস্তুতি চলছে।

