কাজী নূর
যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে এসে উল্টো সর্বস্ব হারিয়ে বাড়ি ফিরছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। চোর, পকেটমার ও সংঘবদ্ধ ‘অজ্ঞান পার্টি’র দাপটে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা। হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে শুরু করে অন্তর্বিভাগের কেবিন ও সাধারণ ওয়ার্ড পর্যন্ত চোর চক্রটি অবাধে বিচরণ করছে। কৌশলে রোগীদের মুঠোফোন, টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালঙ্কার হাতিয়ে নিয়ে সুযোগ বুঝে জনস্রোতে মিশে যাচ্ছে তারা। ফলে কে সাধু আর কে চোর, তা সনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি আগস্ট মাসের প্রথম ২২ দিনেই হাসপাতালে অন্তত অর্ধডজন চুরি ও পকেটমারের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ইতোমধ্যে দুই নারীকে আটক করলেও রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক কমেনি।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অভিযোগ উঠলেও ভুক্তভোগীদের অনেকে মামলা করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। আইনি জটিলতা, হয়রানির আশঙ্কা কিংবা অপরাধী শনাক্ত না হওয়ার হতাশা তাদের পিছিয়ে দেয়। এতে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয় এবং হাসপাতালকেন্দ্রিক অপরাধের একটি চক্র শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পায়।
গত ১৮ আগস্ট ভোরে হাসপাতালের তৃতীয় তলার ২ নম্বর কেবিন থেকে শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া রোডের বাসিন্দা আনসার আলীর একটি স্যামসাং স্মার্টফোন চুরি হয়। ভুক্তভোগীর ছেলে সাইদুজ্জামান বাবু জানান, ভোরে ঘুম থেকে উঠে তারা দেখতে পান ফোনটি নিখোঁজ।
এর কিছুদিন আগে হাসপাতালের স্বেচ্ছাসেবক আকলিমা খাতুনও চুরির শিকার হন। তিনি জানান, ঝিকরগাছা থেকে আসা এক স্বজনকে নিয়ে তিনি বক্ষব্যাধি/করোনারি কেয়ার ইউনিট ভবনের ৪ নম্বর বহির্বিভাগে যান। প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে কোনো এক সময় তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে এনজিওর ঋণের কিস্তির পুরো টাকা বের করে নেয়া হয়।
এদিকে, গত ১০ ও ১৩ আগস্ট একই ভবনের বহির্বিভাগে স্বর্ণের চেইন ছিনতাইয়ের চেষ্টাকালে শিউলি খাতুন ও নিলুফা বেগম নামে দুই নারীকে হাতেনাতে আটক করে দর্শনার্থীরা। পরে তাদের হাসপাতাল ক্যাম্পের পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘অজ্ঞান পার্টি’ বা প্রতারক চক্রের দৌরাত্ম্য। সর্বশেষ ১৯ আগস্ট দুপুরে করোনারি কেয়ার ইউনিটের নিচে চৌগাছার বেড়গোবিন্দপুর এলাকার জেবুন্নেসা (৬৫) নামে এক নারী প্রতারকের খপ্পরে পড়েন। খাদ্যে চেতনানাশক মিশিয়ে তাকে অচেতন করে গলার স্বর্ণের চেইন ও কানের দুল হাতিয়ে নেয়া হয়। ভুক্তভোগীর জামাই আব্দুল হাকিম বাংলার ভোরকে জানান তার শ্বাশুড়িকে বাড়ি পৌঁছে দেয়ার ছলে এক প্রতারক নারী পরিচয় জমায় এবং কৌশলে বিষাক্ত কিছু খাইয়ে নিঃস্ব করে দেয়। এছাড়া, ১৮ আগস্ট সদরের ইছালী গ্রামের মরহুম আবদুর রশিদের স্ত্রী সালমা বেগমকেও (৬০) একইভাবে অচেতন করে কানের দুল ও গলার চেইন খুলে নেয়া হয় বলে ভুক্তভোগীর ছোট বোনের স্বামী যশোর পৌরসভায় কর্মরত সাহেব আলী। পরে তাকে অর্থোপেডিক বিভাগের সামনে থেকে উদ্ধার করে জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট চক্র পরিকল্পিতভাবে এসব অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা অবিলম্বে পুলিশ প্রশাসন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সমন্বিত কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেছেন।
হাসপাতালের একটি সূত্র জানিয়েছে, এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে হাসপাতালকেন্দ্রিক নির্দিষ্ট কিছু চক্র বা প্যাথিডিনসেবীদের পরোক্ষ যোগসাজশ থাকতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপর এক কর্মকর্তা জানান, পুলিশ প্রায়ই অপরাধীদের ধরে, কিন্তু আইনি জটিলতা ও ঝামেলার ভয়ে ভুক্তভোগী বা তাদের স্বজনরা বাদী হয়ে মামলা করতে চান না। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
এ বিষয়ে যশোর জেনারেল হাসপাতাল রোগী কল্যাণ সমিতির নির্বাহী সদস্য খলিলুর রহমান বলেন, অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা সিন্ডিকেট করে এ কাজ করে যাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, এসব অপকর্মের সাথে হাসপাতালে কর্মরত দুর্নীতিপ্রবণ একটি অংশ জড়িত। এজন্য পুলিশ প্রশাসনকে আরো বেশি তৎপর হতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, “রোগী ও তাদের স্বজনদের সচেতন করতে আমরা মাইকিং চালিয়ে যাচ্ছি। এছাড়া পুরো হাসপাতালকে ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার আওতায় আনার পরিকল্পনা চলছে।”
তবে শুধু রোগী ও স্বজনদের সতর্ক করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের। চিকিৎসা নিতে এসে যেন কোনো মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে বাড়ি ফিরতে না হয়-এটাই হওয়া উচিত যশোর জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার। হাসপাতাল হবে নিরাপত্তা ও সেবার আশ্রয়স্থল, অপরাধীদের অভয়ারণ্য নয়।

