বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
চার হাজার একশ’ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প। লক্ষ্য ছিল যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা। অথচ প্রকল্প শুরুর সাড়ে পাঁচ বছর পরও কাজের অগ্রগতি মাত্র ১২ শতাংশ। মূল সড়কের নির্মাণকাজই এখনো পুরোদমে শুরু হয়নি। এরই মধ্যে ঝিনাইদহ অংশে জমি অধিগ্রহণের নামে কোথাও জমির মূল্য বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিক কম নির্ধারণ, আবার কোথাও জমি ও স্থাপনার অতিমূল্যায়নের অভিযোগ উঠেছে। জেলা প্রশাসনের গোপনীয় তদন্তেও এসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। তদন্তে সরকারের শতকোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
অথচ চলতি বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হওয়ার কথা প্রকল্পটির মেয়াদ। হাতে সময় আর মাত্র কয়েক মাস। এই অল্প সময়ে বাকি ৮৮ শতাংশ কাজ কীভাবে শেষ হবে-তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা কঠিন। ফলে চার হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের এ প্রকল্প এখন শুধু ধীরগতির নয়, জমি অধিগ্রহণে অনিয়মের অভিযোগ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্নের মুখে।
ওয়েস্টার্ন ইকোনমিক করিডোর (উইকেয়ার) ফেজ-১-এর আওতায় যশোরের চাঁচড়া চেকপোস্ট থেকে ঝিনাইদহের কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল পর্যন্ত ৪৭ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার মহাসড়ক চারটি মূল লেন ও দুটি সার্ভিস লেনসহ ছয় লেনে উন্নীত করার প্রকল্পটি ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর একনেক সভায় অনুমোদন পায়। প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয় ৪ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ২ হাজার ৭৮৭ কোটি এবং বাংলাদেশ সরকারের ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর।
প্রকল্পটি চাঁচড়া চেকপোস্ট থেকে কালীগঞ্জের মুরাদগড়, মুরাদগড় থেকে কালীগঞ্জ এবং কালীগঞ্জ থেকে ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল-এই তিন লটে ভাগ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় চার লেনের মূল সড়কের পাশাপাশি দুই পাশে দুটি সার্ভিস লেন, একটি রেলওয়ে ওভারপাস, আটটি ফুটওভারব্রিজ, পাঁচটি ভেহিকুলার ওভারপাস, চারটি বড় সেতু, ৫৫টি কালভার্ট এবং একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের কথা রয়েছে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। একটি সেতুর গার্ডার, কয়েকটি কালভার্ট এবং ঝিনাইদহ শহরের বাইপাসের চুটলিয়া মোড়ে ফ্লাইওভারের আংশিক কাজ ছাড়া দৃশ্যমান অগ্রগতি সামান্যই। মূল সড়কের নির্মাণকাজই এখনো শুরু হয়নি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন না হওয়াই এর প্রধান কারণ।
প্রকল্পভুক্ত মহাসড়কের দুই পাশে প্রায় ৩০৪ একর জমি অধিগ্রহণের কথা রয়েছে। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হওয়ার পর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও পুরো জমি বুঝে পায়নি সওজ। জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও পরিশোধে বিলম্ব, বিদ্যুতের খুঁটি অপসারণে ওজোপাডিকো ও পল্লী বিদ্যুতের সমন্বয়হীনতা এবং স্থাপনার মূল্য নির্ধারণে গণপূর্ত বিভাগের দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্পের কাজ আটকে আছে।
এর মধ্যেই সামনে এসেছে আরও গুরুতর অভিযোগ-ঝিনাইদহে জমি অধিগ্রহণের রোয়েদাদ তৈরিতে মূল্য নির্ধারণে বড় ধরনের নয়ছয়। দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগের পর তৎকালীন ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল্লাহ আল মাসউদ তদন্তের নির্দেশ দেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এবিএম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী সরেজমিন তদন্ত শেষে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি জেলা প্রশাসকের কাছে গোপনীয় প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে জমি অধিগ্রহণে অনিয়মের বিভিন্ন তথ্য উঠে আসে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহের বারবাজার, রঘুনাথপুর বাজার, আমবাগান বাজার, দুলালমুন্দিয়া বাজার ও মল্লিকনগর এলাকায় কোনো কোনো জমির মূল্য শতকপ্রতি মাত্র ৪ থেকে ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ স্থানীয় বাজারে একই এলাকার জমির দাম শতকপ্রতি ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ বাজারদরের তুলনায় কয়েক গুণ কম মূল্য নির্ধারণের অভিযোগ উঠেছে।
আবার বিপরীত চিত্রও রয়েছে। ঝিনাইদহের খয়েরতলা, শিবনগর, নিশ্চিন্তপুর, কালীগঞ্জ, আড়পাড়া ও দুলালমুন্দিয়া মৌজার অন্তত ৩৬টি জমি ও স্থাপনার অতিমূল্যায়নের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফার্স্ট কোল্ড স্টোরেজ, সোনালী বস্ত্র বিতান, তারা অ্যাগ্রো রাইস মিল ও দিশারী কাঠগোলার মতো স্থাপনার নামও তদন্তে এসেছে।
তদন্ত কর্মকর্তা এবিএম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, কোনো কোনো জমি বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে অধিগ্রহণ করা হয়েছে। আবার আইনের মারপ্যাঁচ ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি কোটি কোটি টাকার অতিরিক্ত সুবিধা পেয়েছেন। অধিগ্রহণ শাখার নথি ও সরেজমিন তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। অতিমূল্যায়নের কারণে সরকারের শতকোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে প্রকল্পের নামে মহাসড়কের নিয়মিত সংস্কারও বন্ধ রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য গর্ত ও খানাখন্দ। ধুলাবালিতে আচ্ছন্ন সড়কে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন। বাড়ছে দুর্ঘটনা। যাত্রীদের ভোগান্তিও চরমে উঠেছে।
জানযায়, যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের পালবাড়ী থেকে চুড়ামনকাটি, সাতমাইল থেকে বারোবাজার সড়কের অবস্থা এখন বেহাল। কোথাও বড় বড় গর্ত, কোথাও উঠে গেছে পিচের আস্তরণ। আবার কোনো কোনো বাজার এলাকায় মূল সড়কের ভাঙা অংশে ইটের সলিং দিয়ে কোনোরকমে জোড়াতালি দেয়া হয়েছে। এতে যানবাহন চলাচলে তৈরি হচ্ছে চরম ঝুঁকি।
বিশেষ করে পালবাড়ী থেকে চুড়ামনকাটি অংশে সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোতে যানবাহনকে ধীরগতিতে চলতে হচ্ছে। ভারি যানবাহন চলাচলের সময় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ছে। কোথাও গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে যানবাহনকে বিপরীত লেনে উঠে যেতে হচ্ছে। এতে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকিও বাড়ছে।
একসময় যশোর থেকে ঝিনাইদহ যেতে যেখানে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগত, সড়কের বেহাল দশায় এখন সেখানে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি সময় লাগছে। এতে যাত্রীদের যেমন সময়ের অপচয় হচ্ছে, তেমনি পণ্যবাহী যানবাহনের পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে।
যশোর-কুষ্টিয়া রুটের বাসচালক রুবেল মিয়া বলেন, বিভিন্ন স্থানে রাস্তা খুঁড়ে দীর্ঘদিন ফেলে রাখায় বড় বড় গর্ত হয়েছে। এতে গাড়ি চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রায়ই গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে।
ওই রুটে চলাচলকারী সরকারি কর্মচারী শামিমা আক্তার ও মিনা আফরোজ বলেন, সারা রাস্তা ভাঙাচোরা। প্রতিদিন যাতায়াতে অসহনীয় কষ্ট হয়। তাদের ভাষায়, ‘ছয় লেন লাগবে না, শুধু চলাচলের ভালো রাস্তা চাই।’
উইকেয়ার ফেজ-১-এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নিলন আলী বলেন, জমি অধিগ্রহণের কাজ তিন বছর ধরে চলছে। জমি বুঝে না পাওয়ায় নির্ধারিত জায়গায় কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। যেসব স্থানে জমি বুঝে পাওয়া গেছে, সেখানে আংশিক কাজ চলছে। সম্পূর্ণ জমি বুঝে পেলেই মূল কাজ পুরোদমে শুরু হবে।
ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা মেহেদী হাসান জানান, ঝিনাইদহ অংশ কালীগঞ্জ ও সদর—দুই ভাগে বিভক্ত। কালীগঞ্জ অংশের ক্ষতিপূরণসহ অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। সদর অংশের দাপ্তরিক প্রক্রিয়া চলছে। জটিলতা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।
যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট গুঞ্জন বিশ্বাস জানান, মহাসড়কের দুই পাশের জমি, স্থাপনা, গাছগাছালির ক্ষতি পূরণ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরকে চিঠি দেয়া হয়েছে। ক্ষতি পূরণ নির্ধারণ এবং তা বরাদ্দ হয়ে আসলে সেগুলো প্রদান করে কাজ শুরু করা যাবে।’
