বাংলার ভোর প্রতিবেদক
যশোরের বাঘারপাড়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের আন্তঃউপজেলা বদলি প্রক্রিয়ায় নীতিমালা লঙ্ঘন ও নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শূন্য পদ না থাকা বিদ্যালয়ে শিক্ষক বদলি, পাঁচজন বা তার কম শিক্ষক থাকা বিদ্যালয় থেকে বদলি, জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা এবং প্রতিস্থাপক দেখিয়ে বদলি করার অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি আবেদন গ্রহণের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পর বদলির তালিকায় পরিবর্তন এনে নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন শিক্ষক। অভিযোগকারীদের দাবি, বদলি-সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনায় আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই এবং চূড়ান্ত বদলি আদেশের মধ্যে একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। এ নিয়ে শিক্ষক মহলেও দেখা দিয়েছে অসন্তোষ।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সহকারী শিক্ষকদের শূন্য পদে বদলির জন্য গত ২২ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর অফিস চলাকালীন সময়ের মধ্যে আবেদন আহ্বান করা হয়। এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শেখ মুশফিকুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বদলি-সংক্রান্ত ছয়টি শর্ত উল্লেখ করা হয়। পরে ২৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ‘উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তিকরণ’ কমিটির সভা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ভূপালী সরকারের সভাপতিত্বে সভায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সদস্যসচিব, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবং দুজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র জানায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাঘারপাড়ার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৭ জন শিক্ষক বদলির জন্য আবেদন করেন। যাচাই-বাছাই শেষে উপজেলা কমিটি শূন্য পদের বিপরীতে ১৩টি আবেদন গ্রহণ এবং ১৪টি আবেদন বাতিল করে। তবে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত বদলি আদেশে ১৮ জন শিক্ষককে বদলি করা হয়। এর মধ্যে অন্তত ১১ জনের বদলির ক্ষেত্রে নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকদের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় শূন্য পদের বিপরীতে বদলির কথা বলা হলেও চূড়ান্ত তালিকায় এমন কয়েকটি বিদ্যালয়ের নাম রয়েছে, যেখানে কোনো শূন্য পদ নেই। একই সঙ্গে বদলির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতার শর্তও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
বদলি আদেশের ৩, ৫, ৬, ১০, ১১, ১৩ ও ১৪ নম্বর ক্রমিকে থাকা শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বদলি নীতিমালার ২.০-এর (ঘ) ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ওই ধারায় পাঁচজন বা তার কম শিক্ষক কর্মরত থাকা বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে ।
অভিযোগ অনুযায়ী, ৩ নম্বর ক্রমিকে থাকা সঞ্চিতা বিশ্বাস বোয়ালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত। বিদ্যালয়টিতে পাঁচজন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও তাকে বদলি করা হয়েছে। ৫ নম্বরে থাকা মোস্তাফিজুর রহমানকে প্রতিস্থাপক সাপেক্ষে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ৬ নম্বরে থাকা মনিরুজ্জামানের বদলিতেও নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। ৭ নম্বরে থাকা আনিষা সুলতানাকে প্রতিস্থাপক সাপেক্ষে বদলি করা হয়েছে।
শিক্ষকদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, আদি ধলগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চারজন, নওয়াপাড়া পশ্চিমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচজন, আন্দারকোটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনজন, জয়রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচজন, গরীবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চারজন এবং ধুপখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চারজন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। এসব বিদ্যালয় থেকেও বদলির আদেশ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। ১০ নম্বর ক্রমিকে থাকা আবু ঈসা আন্দারকোটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত। বিদ্যালয়টিতে তিনজন শিক্ষক থাকলেও তাকে প্রতিস্থাপক সাপেক্ষে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ওই তিনজনের একজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে এবং অন্যজন পিটিআইয়ে প্রশিক্ষণে রয়েছেন। ফলে বদলির পর বিদ্যালয়টির পাঠদান কার্যক্রম আরও সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ১৩ নম্বরে থাকা শান্তা আরাকেও প্রতিস্থাপক সাপেক্ষে বদলি করার অভিযোগ রয়েছে। ১৪ নম্বরে থাকা ফিরোজা খাতুনের বিদ্যালয় থেকে তিনজন শিক্ষক বদলির আবেদন করেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে তাকে প্রতিস্থাপক সাপেক্ষে পূর্ব পাইকপাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। ওই বিদ্যালয়ে কোনো শূন্য পদ নেই বলেও দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। এ ছাড়া ১৫ ও ১৬ নম্বর ক্রমিকে থাকা শিক্ষককে জামদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, ১৭ নম্বরে থাকা শিক্ষককে দক্ষিণ শ্রীরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং ১৮ নম্বরে থাকা শিক্ষককে নারিকেলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বিদ্যালয়েও শূন্য পদ না থাকা সত্ত্বেও বদলির আদেশ দেয়া হয়েছে।
১৬ নম্বরে থাকা জাহাঙ্গীরকে শূন্য পদ ছাড়াই জামদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ। ১৭ নম্বরে থাকা মাহমুদুল হাসানকে দক্ষিণ শ্রীরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শূন্য পদ না থাকা সত্ত্বেও প্রতিস্থাপক সাপেক্ষে বদলি করা হয়েছে। ১৮ নম্বরে থাকা প্রসেনজিৎ ঠাকুরের নামেও অনলাইনে বদলি আদেশ রয়েছে।
এরপরও তাকে নারিকেলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শূন্য পদ না থাকা সত্ত্বেও প্রতিস্থাপক সাপেক্ষে বদলির সুযোগ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
বদলি প্রক্রিয়া নিয়ে কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তিকরণ কমিটির অনেক সদস্যকে পাশ কাটিয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নিজেই বদলি প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছেন। তাদের অভিযোগ, বদলি করিয়ে দেয়ার কথা বলে শিক্ষকদের কাছ থেকে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়েছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, বদলি প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে একটি ‘বদলি-বাণিজ্য’ গড়ে উঠেছে। এতে নীতিমালা মেনে বদলির জন্য আবেদন করা প্রকৃত দাবিদার শিক্ষকরা বঞ্চিত হয়েছেন। শূন্য পদ ও জ্যেষ্ঠতার শর্ত উপেক্ষা করে বিভিন্ন শিক্ষককে বদলির সুযোগ দেয়ায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
এদিকে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শেখ মুশফিকুর রহমানের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষক। তাদের দাবি, তিনি খুলনার খালিশপুরের বাসা থেকে কর্মস্থলে যাতায়াত করেন। এ কারণে নিয়মিত নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, একটি বিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে যশোর রেলস্টেশন থেকে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে মোটরসাইকেলে করে উপজেলা সদরে নিয়ে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। এর ফলে ওই শিক্ষক দীর্ঘদিন কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিত হতে পারছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বিদ্যালয়ের পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন শিক্ষক।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষক। তাদের অভিযোগ, নিজেকে সরকারি দলের একজন ক্ষমতাধর কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করে তিনি বিরোধীদের নিয়ে বিভিন্ন আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শেখ মুশফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নই। আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি ভূপালী সরকারের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঢাকায় একটি প্রশিক্ষণে থাকায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জি এম আলমগীর কবির বলেন, ‘শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্তে তা প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
